টানা অবরোধ, ধর্মঘট এবং মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের (আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর-এজেকে) বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পুঞ্চ বিভাগে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। গত জুন মাসে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) নিষিদ্ধ করার পর থেকেই অঞ্চলটিতে বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও সংঘর্ষ শুরু হয়। সংগঠনটি কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আইনসভার ১২টি আসন বাতিলসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছিল। আগামী ২৭ জুলাই থেকে অঞ্চলটিতে ধাপে ধাপে আইনসভা নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
পুঞ্চ বিভাগের কেরি কোট গ্রামের বাসিন্দা জহির ইকবালের অভিজ্ঞতা বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। গত জুনের মাঝামাঝি তার বড় ভাই তীব্র বুকে ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় তাকে খাটে শুইয়ে দীর্ঘ পথ কাঁধে করে প্রধান সড়কে নিয়ে যেতে হয়। এরপর প্রতিবেশীদের মোটরসাইকেলের জ্বালানি ব্যবহার করে তাকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের হাজিরা সরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৪০ কিলোমিটার দূরের ইসলামাবাদে যেতে হয়। জহির ইকবাল জানান, বিক্ষোভ ও ইন্টারনেট বন্ধের কারণে তাদের গ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ। বিদেশে থাকা আত্মীয়দের পাঠানো অর্থেই তাদের সংসার চলছে। তিনি আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেবেন না বলেও জানিয়েছেন।
গত ৫ জুন থেকে পুরো এজেকেজুড়ে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা চরম সংকটে পড়েছে। পাল্লানদারি এলাকার সরকারি স্নাতকোত্তর কলেজের অধ্যক্ষ মাসুদ খান জানান, ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় যোগাযোগের চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পাকিস্তানের মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার মাঝপথে বাকি তিনটি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে এবং ছয় সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। এতে পুরো একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে শিক্ষার্থীরা।
ব্যবসায়ীদের অবস্থাও নাজুক। সুদনোতি জেলার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মালিক নিয়াজ আহমদ জানান, সড়ক অবরোধের কারণে সরকারি ভর্তুকির গম সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এখন ব্যবসায়ীদের প্রায় ৬ হাজার রুপি দিয়ে আটা কিনতে হচ্ছে, যা আগে ২ হাজার ২০০ রুপিতে পাওয়া যেত। মুজাফফরাবাদের মুদ্রণ ব্যবসায়ী মালিক দাউদ জানান, ইন্টারনেট না থাকায় তার ব্যবসা সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে এবং তিনি প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি পাকিস্তানি রুপির ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই শহরের আইনজীবী উসমান গুল জানান, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ব্যাংক ও এটিএম অচল হয়ে পড়ায় তার বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান স্থগিত করতে হয়েছিল।
পাক সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, মুজাফফরাবাদ ও মিরপুর বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নির্বাচনী প্রচার চলছে। তবে পুঞ্চ ও সুদনোতির বাসিন্দারা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা এখনো জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে ভুগছেন। স্থানীয় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কয়েকটি ঘটনার জন্য কেন পুরো জনগণকে এভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হবে।





