জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্য ও অনৈক্য একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এই টার্নিং পয়েন্টটি মূলত সুশাসন, গণ-আন্দোলন ও আত্মত্যাগের প্রতীক। বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাত্র দুই বছরের মাথায় ওই আন্দোলনে পক্ষের শক্তিগুলো এখন ১৭টি ভাগে বিভক্ত। এই বিভেদ যত প্রকট হবে, পতিত ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনা ততই শক্তিশালী হবে। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার দেশে ফেরার হুংকার এই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্নের জন্য হুমকিস্বরূপ।
আন্দোলনের মাত্র দুই বছরের মাথায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন তিন মেরুতে অবস্থান করছে। বিএনপি নিজেদের মতো করে সরকার পরিচালনা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়ছে। এমনকি এনসিপি ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। হবিগঞ্জ ও সিলেটে এনসিপির কর্মসূচিতে বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনা এবং সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে মতপার্থক্য সংঘাতময় রাজনীতির আভাস দিচ্ছে। এতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উৎসাহিত হচ্ছে এবং কিছু বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী সতর্ক করে বলেছেন, ঐক্যবদ্ধ না থাকলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোকে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব হানাহানিতে রূপ নিলে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভকর নয়। তিনি বলেন, এই দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে পরাজিত শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন কাজী মাহবুব রহমানও জুলাইয়ের স্পিরিট বাস্তবায়নে ধৈর্যশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দাবি করেছেন, জুলাইয়ের মাধ্যমেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি জানান, বিএনপি জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করেই সংবিধান সংশোধন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, তারা রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, জুলাইয়ের চেতনা হারিয়ে গেলে দেশ আবার স্বৈরাচার ও বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার জানান, নতুন শক্তির উত্থানে ভীত হয়ে তাদের ওপর হামলা করা হচ্ছে, তবে তারা জুলাইয়ের স্পিরিট থেকে বিচ্যুত হবেন না। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে দলগুলোর মধ্যে সংঘাতের চেয়ে সমঝোতা ও জাতীয় ঐক্য এখন সময়ের দাবি।





