আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, হাতে হাতকড়া নিয়ে বিতর্ক

প্রকাশ:

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে থাকা পটুয়াখালী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের হাতে এক মাস ধরে হাতকড়া পরিয়ে রাখা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৪ জুন থেকে তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন এবং ভর্তির দুই দিন পরই তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

২৫ জুলাই, শনিবার, হাসপাতালের আইসিইউর সামনে মিজানুর রহমানের মা মাতোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে জানান, ভর্তির পর দুদিন তাঁর ছেলে কেবল ‘ও-মা’ বলে ডাকছিলেন। এরপর তিনি দিনদুনিয়ার কোনো খেয়াল রাখতে পারেননি, এমনকি মাকেও চিনতে পারেননি। তাঁর পুরো শরীরই প্যারালাইজড হয়ে গেছে। সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যায়, মিজানুর রহমানের গলায় মোটা পাইপ ও নাকে নল লাগানো এবং ডান হাতে মোটা দড়িসহ হাতকড়া পরানো। অথচ সেই হাতেই অক্সিমিটার লাগানো রয়েছে। মিজানুর রহমানের স্ত্রী সালমা জাহান ছবিটি তাঁর স্বামীর বলে নিশ্চিত করলেও, আইসিইউ থেকে কীভাবে বা কে ছবিটি ছড়িয়েছে তা তাঁরা জানেন না।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মিজানুর রহমান (৪৮) লাইফ সাপোর্টে আছেন এবং তাঁর বাঁচার সম্ভাবনা অনিশ্চিত। তাঁর অবস্থা বেশ কয়েকবার খারাপ হওয়ায় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতেও বলা হয়েছে। আইসিইউর সামনে তিন দফায় পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগী পালানোর মতো অবস্থায় নেই এবং হাতকড়া পরানোয় ক্যানুলা লাগানোসহ চিকিৎসায় বিঘ্ন ঘটেছে। হাতকড়ার রশিটিও সেভাবে জীবাণুমুক্ত করা হয়নি। আইসিইউতে রোগীর হাতে হাতকড়া লাগানোকে খুবই অমানবিক বলে উল্লেখ করেছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।

সালমা জাহান জানান, গত সপ্তাহের সোমবার চিকিৎসকরা তাঁর স্বামীর অবস্থা খুব খারাপ জানালে অনুরোধের পর পুলিশ হাতকড়া খুলে দেয়। এর আগে বহুবার খুলতে বললেও দায়িত্বরত পুলিশ ‘নিয়ম নেই’ বলে হাতকড়া খুলতে রাজি হয়নি। অর্থাৎ, প্রায় এক মাস মিজানুর রহমান আইসিইউতে হাতকড়া পরেই ছিলেন।

মিজানুর রহমান পটুয়াখালী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পটুয়াখালী জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর পটুয়াখালীতে তাঁর বাড়িতে হামলা হয়েছিল। তিনি খুন, হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলার আসামি। ঢাকার পল্টন থানার একটি মামলায় ১১ মাস আগে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে ছিলেন।

সালমা জাহান আরও জানান, গত ৯ জুন কাশিমপুর কারাগারে মিজানুর রহমান অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁদের কোনো খবর দেয়নি। পরিচিত এক আসামির আত্মীয়ের মাধ্যমে তাঁরা খবরটি জানতে পারেন। মিজানুর রহমানকে প্রথমে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল হয়ে আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয় এবং পরে আইসিইউতে নেওয়া হয়।

মিজানুর রহমান পাঁচ বোনের একমাত্র ভাই এবং ২০ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবার তাঁর ওপরই নির্ভরশীল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর সামনে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে তাঁর মা, স্ত্রী, বোনসহ স্বজনেরা পালা করে থাকছেন। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর একটি হত্যা মামলায় ঢাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, যেখানে তাঁকে ‘সন্দিগ্ধ আসামি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী সালমা জাহানও তিনটি মামলায় পটুয়াখালী জেলা কারাগার এবং কাশিমপুর মহিলা কারাগারে ছয় মাস ছিলেন এবং বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন। তিনি পটুয়াখালী সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

মিজানুর রহমানের আইনজীবী এইচ এম সারোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে জানান, এ পর্যন্ত পটুয়াখালী ও ঢাকায় মোট আটটি মামলায় মিজানুর জামিন পেয়েছেন। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় গত ২৩ জুন আবার আরেকটি মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তাঁকে আদালতে তলব করা হয়েছিল। ৩০ জুলাই ভার্চ্যুয়ালি শুনানির আদেশ হয়েছে।

আইসিইউর সামনে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা হাতকড়া পরানো নিয়ে জানতে চাইলে জানান, তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পালন করেন এবং নিজে থেকে হাতকড়া খোলার এখতিয়ার তাঁদের নেই। কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হাতকড়া মূলত আসামি যাতে পালাতে না পারে বা নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আসামিদের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা আপত্তি করলে তা খুলে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ‘অসুস্থ কোনো ব্যক্তির হাতে হাতকড়া থাকবে, আমরাও এটা প্রত্যাশা করি না। তবে আমাদের এখনো কিছু দুর্বলতা তো আছেই। কারাবন্দীদের বিভিন্ন হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। নিরাপত্তার প্রশ্নটি থেকেই যায়। হাসপাতালে এই আসামিদের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্তরাও নানা দ্বিধার মধ্যে থাকেন।’ তিনি স্বীকার করেন যে, হাতকড়ার ব্যবহার নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গাইডলাইন বা নীতিমালা তৈরি করা হয়নি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আসামিদের হাতে হাতকড়া পরানো নিয়ে এর আগেও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৫ বছর বয়সে মারা যান সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। তাঁর হাতে হাতকড়া পরানো অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকার ছবি তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।

২০১৮ সালের ৩ জুলাই হাইকোর্ট রায় দেন যে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের হাতকড়া পরানোর ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার করা যাবে না এবং সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে বলা হয়। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইনজীবী আবু ওবায়দুর রহমান তখন গণমাধ্যমে বলেছিলেন, হাতকড়া পরানোর ক্ষেত্রে পুলিশ প্রবিধান বা পিআরবির বিধান মেনে চলা উচিত। এই বিধানের বাইরে গিয়ে কাউকে হাতকড়া পরালে তা হবে মানবাধিকারের লঙ্ঘন। বেঙ্গল পুলিশ রেগুলেশনের প্রবিধান ৩৩০-এ হাতকড়া–সংক্রান্ত বিধান রয়েছে, যেখানে শুধু পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে যতটুকু প্রয়োজন, তার বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপে নিষেধ করা হয়েছে।

২০১৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের পর হাসপাতালে হাতকড়া পরা অবস্থায় রাখা হয়েছিল। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদন নজরে আনার পর ২০১৭ সালের ২৯ মে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাতকড়া পরানোর ব্যাখ্যা দিতে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আদালতে তলবও করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের ১০ আইনজীবী তিন সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও কারা মহাপরিদর্শক বরাবর আইনি নোটিশ পাঠিয়েছিলেন, যেখানে আসামিদের অবৈধভাবে ডান্ডাবেড়ি ও হাতকড়া পরানোর চর্চা রোধ এবং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানানো হয়। পরে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কায়সার কামালের দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে কারাবন্দী ও হাজতিদের হাতকড়া পরানো–সংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রণয়নে কমিটি গঠন নিয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হাইকোর্ট ১৮৯৪ সালের প্রিজনস অ্যাক্ট ও জেল কোডের সংশ্লিষ্ট বিধি ‘স্বেচ্ছাচারী ও অযৌক্তিকভাবে’ ব্যবহার করে সাধারণ বন্দীদের ডান্ডাবেড়ি ও হ্যান্ডকাফ বা হাতকড়া পরানো কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দেন। ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর যশোরের যুবদল নেতা মো. আমিনুর রহমানকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার বৈধতা নিয়ে রিট আবেদন করেন আমিনুর রহমানের স্ত্রী নাহিদ সুলতানা। হাসপাতালের শয্যায় পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় আমিনুরের ছবিও তখন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছিল। চিকিৎসাধীন, বিশেষ করে আইসিইউতে থাকা রোগীর ক্ষেত্রে হাতকড়া পরানোর বিষয়ে একটি নীতিমালা থাকা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে চিকিৎসকেরাও মনে করেন।

শেয়ার করুন