অভিযানে বন্ধ ঘোষণার পরও ফের চালু অনিয়মে ভরা হাসপাতাল-ক্লিনিক

প্রকাশ:

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে অবস্থিত ছয়টি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও একটি ব্লাড ব্যাংকসহ বিভিন্ন বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত মার্চ মাসে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল। ভুয়া চিকিৎসক, অনুমোদনের অভাব, আইসিইউ পরিচালনায় অনিয়ম এবং প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতির অভিযোগে ২৩, ২৪ ও ২৫ মার্চ পর্যন্ত টানা অভিযানে চারটি হাসপাতাল ও ছয়টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ১০ শয্যার একটি ক্লিনিক পরিচালনার জন্য চিকিৎসক, পোস্ট-অপারেটিভ রুম, লেবার রুম, নার্স স্টেশন, স্টেরিলাইজেশন রুম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অপেক্ষমাণ কক্ষসহ অন্তত ১৩ ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই পুনরায় রোগী ভর্তি, অস্ত্রোপচার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সব ধরনের সেবা চালিয়ে যাচ্ছে।

বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মিরপুর রোডের ডক্টরস কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মোহাম্মদপুরের টিজি মাল্টি স্পেশালাইজড হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চানখাঁরপুলের আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতাল এবং অথেনটিক হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এছাড়া প্রাইম অর্থোপেডিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল ও যমুনা হাসপাতালের আইসিইউ ও এনআইসিইউতে রোগী ভর্তি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অভিযানের তালিকায় রয়েল মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অ্যাকটিভ ব্লাড ব্যাংক এবং ঢাকা ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই আগের মতোই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অনিয়ম বজায় রেখে চলছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এবং অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব প্রতিষ্ঠান ফের কার্যক্রম শুরুর সাহস পেয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল সংলগ্ন ক্লিনিকগুলোতে দালালদের মাধ্যমে রোগী সংগ্রহের অভিযোগ পুরনো। অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও নবায়ন ছাড়াই ব্যবসা চলছে। যেমন, যমুনা হাসপাতাল ও রয়েল মাল্টিস্পেশালিটির লাইসেন্সের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়েছে, অথচ তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারের এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ২০২১ সালেও অভিযান চালিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মিটফোর্ড এলাকার ইস্টার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দেখা যায়, মাত্র ১২টি কক্ষের বদলে দুটি কক্ষ নিয়ে কার্যক্রম চলছে এবং সাইনবোর্ডে ১৯ জন চিকিৎসকের নামের বিপরীতে মাত্র ১০ জন নিয়মিত উপস্থিত থাকেন।

বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. এ এম শামীম স্বীকার করেছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার সহকারী পরিচালক মাহমুদুর রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু হয়েছে কি না সে বিষয়ে তার কাছে তথ্য নেই। পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, কেবল অভিযান বা জরিমানা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং কার্যকর প্রশাসনিক নজরদারি অত্যাবশ্যক। অন্যথায়, মানহীন সেবা ও ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণে সাধারণ রোগীরা প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে থাকবেন।

শেয়ার করুন