সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করার পর তাঁর সংসদ সদস্য পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) চিঠি দেওয়া হলেও এখনো তাঁর এমপি পদ বহাল রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, গাজী নজরুল বর্তমানে কোন দলের সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন, নাকি তিনি স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে আছেন।
৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলাম অবশ্য নিজেকে এখনো জামায়াতের সংসদ সদস্য হিসেবেই দাবি করছেন। সম্প্রতি তিনি জানান, দল তাঁকে বহিষ্কার করলেও আল্লাহর রহমতে তাঁর সদস্যপদ এখনো রয়েছে। তিনি মনে করেন, খাতা-কলমে এবং সব জায়গায় তিনি এখনো জামায়াতের সদস্য হিসেবেই আছেন। তবে জামায়াত কী বলছে, সে বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই।
অন্যদিকে জামায়াত নেতাদের দাবি ভিন্ন। তাঁদের মতে, বহিষ্কারের পর গাজী নজরুলের সঙ্গে দলের আর কোনো সম্পর্ক নেই। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সাতক্ষীরা-১ আসনের এমপি মো. ইজ্জত উল্লাহ জানান, গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের চিঠি ইতিমধ্যে সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে দলের কোনো যোগাযোগ নেই এবং তিনি কী বলছেন তা তাঁদের জানা নেই। জামায়াতের দলীয় হুইপ ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খানও একই কথা বলেন। তিনি জানান, দল থেকে বহিষ্কারের পর স্পিকার ও ইসিকে চিঠি দিয়ে দলের পক্ষ থেকে যা করণীয়, তার সবই করা হয়েছে।
গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের পর সংসদে তাঁর অবস্থান নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। গত ১৮ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, যদিও তিনি এই ১০ সদস্যের কমিটির একজন সদস্য। কমিটির সভাপতি ও বিএনপির এমপি মনিরুল ইসলাম চৌধুরী সে সময় জানান, জামায়াতের আপত্তির কারণেই তাঁকে ডাকা হয়নি। এ ছাড়া সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটিতে তাঁর নাম রাখা নিয়ে সংসদে বিতর্ক হয় এবং বিরোধী দলের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত কমিটি থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়। এসব ঘটনার পর সংসদে তাঁর দলীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর আসন এখনো বহাল রয়েছে।
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বহিষ্কারের পর গাজী নজরুলকে দল থেকে পদত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। অতীতে বহিষ্কৃতদের ভুল স্বীকার করে দলে ফেরার নজির থাকলেও গাজী নজরুল সে পথে না হেঁটে সরাসরি কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। গত ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন তিনি বিরোধী দলের হয়ে vote দেওয়ার সুযোগ পেতে বিরোধী দলের একাধিক এমপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কিন্তু জামায়াত নেতাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাননি। দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে তিনি যোগাযোগের চেষ্টা করলেও জামায়াত নেতারা বলছেন, তাঁর বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। এমনকি তাঁর আসনে বিকল্প প্রার্থী তৈরির কাজও শুরু করেছে দলটি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক সদস্য বলেন, গাজী নজরুল যেভাবে দলে ফিরতে চাইছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয় এবং তাঁর বহিষ্কারের বিষয়ে দল অবস্থান বদলাবে না।
গাজী নজরুলের এমপি পদ থাকা না-থাকার বিষয়টি এখন স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সংবিধান অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনের কারণে কোনো দল কাউকে বহিষ্কার করলেই তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। সংবিধানে সংসদ সদস্য পদ হারানোর ক্ষেত্রে নৈতিক স্খলনের পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। জামায়াতের চিঠির বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বা নির্বাচন কমিশন এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।
সংসদ সচিবালয়ের সূত্র অনুযায়ী, দশম সংসদে আওয়ামী লীগের তৎকালীন এমপি আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়েও একই রকম জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ২০১৪ সালে বিতর্কিত মন্তব্যের পর আওয়ামী লীগ তাঁকে বহিষ্কার করে এবং তাঁর এমপি পদ বাতিলের জন্য স্পিকারকে চিঠি দেয়। পরে স্পিকার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ইসিকে চিঠি দিলেও ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকী নিজেই সংসদে বক্তব্য দিয়ে পদত্যাগ করেন। এরপর তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করেন তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। গাজী নজরুলের বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বর্তমানে ওমরাহ পালনের জন্য মদিনায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকে এক বার্তায় তিনি জানান, গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করায় তিনি এখন কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে সংবিধান অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য পদ হারানোর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
উল্লেখ্য, সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে তিনবার এমপি নির্বাচিত হওয়া গাজী নজরুলের একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গত ২২ জুলাই 'নৈতিক স্খলন'-এর অভিযোগে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। এরপরই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও ইসিকে চিঠি দেয় দলটি।





