যুদ্ধ কেবল জীবনই কেড়ে নেয় না, বরং অনেক সময় প্রিয়জনের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগটুকুও কেড়ে নেয়। গাজার সাম্প্রতিক এক গণদাফনের দৃশ্য সেই নির্মম বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর গাজা সিটির সাবরা এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১১২ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল। প্রায় দুই সপ্তাহের টানা উদ্ধার অভিযানের পর অবশেষে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে একসঙ্গে দাফন করা হয়েছে।
গাজা সিটিতে আয়োজিত এই গণদাফনে হাজারো মানুষ অংশ নেন। নিহতদের মরদেহ সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছিল এবং প্রতিটি দেহ ফিলিস্তিনি পতাকায় মোড়ানো ছিল। অনেকের মরদেহের ওপর তাদের ছবি রাখা হয়, যা এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। স্বজনরা অশ্রুসিক্ত চোখে তাদের প্রিয়জনদের শেষ বিদায় জানান। নিহতদের বেশিরভাগই একই পরিবারের সদস্য; যাদের মধ্যে ৪৪ জন শিশু, ৩৮ জন নারী এবং সাতজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছিলেন। হামলার সময় ভবনটিতে বহু সাধারণ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন।
উদ্ধারকাজ চলাকালে স্বজনরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে উদ্ধারকর্মীদের ধ্বংসস্তূপের নিচে মরদেহের অবস্থান চিহ্নিত করতে সহায়তা করেছেন। নাহেদ আল-হাসাইনা নামের এক স্বজন ধ্বংস হয়ে যাওয়া বসার ঘরের ধ্বংসস্তূপ দেখিয়ে বলেন, এটি এমন এক বেদনাদায়ক অনুভূতি যা উপস্থিত প্রত্যেকের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। তিনি দুই শিশুর ব্যবহৃত জিনিসপত্র—ওমরের স্কুলব্যাগ এবং ইব্রাহিমের জুতা—হাতে তুলে ধরে প্রশ্ন রাখেন, শিশুরা কী অপরাধ করেছিল? ইউসুফ আবু শারিয়া জানান, তিনি তার পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে আজ কথা বলছেন; তিনি তার মা, বাবা, চাচা ও চাচাতো ভাই-বোনসহ পুরো পরিবারকে হারিয়েছেন।
স্থানীয়দের ধারণা, ঘটনাস্থলের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও আরও কয়েক ডজন মরদেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে। গাজা উপত্যকাজুড়ে হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের সময় ধ্বংস হওয়া অসংখ্য ভবনের নিচে অনেকের দেহাবশেষ আটকে আছে। যদিও এত দীর্ঘ সময় পর প্রিয়জনদের খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কষ্টের, তবুও তাদের যথাযথভাবে দাফন করতে পেরে স্বজনরা কিছুটা মানসিক শান্তি পেয়েছেন। এই গণদাফন আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা এই সংঘাতের সবচেয়ে অসহায় শিকার। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগ আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।





