যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডিজেলের রেকর্ড উচ্চমূল্য ঠেকাতে বড় ধরনের পদক্ষেপের কথা ভাবছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশ থেকে ডিজেল রপ্তানি সীমিত কিংবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন (৩.৭৯ লিটার) ডিজেলের গড় দাম ৬.৫০ ডলারে পৌঁছায়, যা এক মাস আগেও ছিল ৫.৬১ ডলার। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ) প্রতিদিনের জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য জানিয়েছে। বিশ্বজুড়ে বেড়েছে ডিজেলসহ জ্বালানি পণ্যের দাম। ভোক্তাদের খরচ কমাতে ডিজেল রপ্তানি কমানো বা বন্ধ করার পক্ষে চাপ দিচ্ছেন দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা।
নির্বাচন সামনে রেখে এই পরিস্থিতি দেশটির রাজনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে। রয়টার্স ও ইপসসের আগস্ট মাসের জরিপে ৪৭ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ই তাদের কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এছাড়া ম্যারিস্টের নতুন একটি জরিপে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভোটাররা রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটদের ওপর বেশি আস্থা রাখছেন; ৪২ শতাংশ নাগরিক ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করছে, যেখানে রিপাবলিকানদের সমর্থনের হার ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ জীবনযাত্রার ব্যয় মাত্রাছাড়া হয়ে গেলে সরকারি দলকে তাঁরা ভোট দেবেন না। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতি’র কথা বলেছেন অর্ধেকেরও কম ভোটার।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, ডিজেল রপ্তানি স্বেচ্ছায় কমানোর বিষয়ে বড় তেল শোধনাগারগুলোর আগ্রহ আছে কি না, তা যাচাই করতে তিনি আলোচনা চালাচ্ছেন। গত মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও ডিজেল রপ্তানি কমানোর বিষয়টিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ সহযোগী ফেলো র্যাচেল জিয়েম্বো জানান, যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলো বর্তমানে তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে, তবুও বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি কাটছে না।
জ্বালানি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেখা যায়, ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মজুত কমে ১০ কোটি ৭৯ লাখ ব্যারেলে নেমেছে, যা গত চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ডিজেল রপ্তানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র; দেশটির মোট অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের প্রায় ৪০ শতাংশের সমপরিমাণ জ্বালানি তারা রপ্তানি করে। বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি বন্ধ করলে স্থানীয় বাজারে কিছুটা দাম কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের তীব্র সংকট ও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হবে। দেশটির উৎপাদকেরা চাইলে ডিজেল দেশের বাজারে বিক্রি করতে পারেন, আবার আন্তর্জাতিক বাজারেও বিক্রি করতে পারেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি বন্ধ হলে শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে এবং সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে উল্টো পেট্রল আমদানি করতে হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের মতো দেশগুলোর ওপর, যাদের জন্য জ্বালানি সংগ্রহের বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। এছাড়া বৈশ্বিক পর্যায়ে এই ঘাটতি পূরণের সক্ষমতা বর্তমানে কেবল চীনের হাতে থাকলেও, বেইজিং তাদের নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের বাইরে গিয়ে এই দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর ভিন্ন দিক আছে।
এই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মূলে রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার ফলে সৃষ্ট সরবরাহ বিঘ্ন। এছাড়া রাশিয়ায় ড্রোন হামলার কারণে দেশটির বেশ কিছু শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে ডিজেলের মজুত কমিয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে একক পণ্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিজেল আমদানিতে, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩.৩১ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় দ্বিগুণ হওয়ার ঝুঁকির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৩১ কোটি বা ৩ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের ডিজেল আমদানি হয়েছে, একক পণ্য হিসেবে আমদানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে যা শীর্ষে।





