অর্থবছর এপ্রিল-মার্চে রূপান্তর: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের বিশ্লেষণ

প্রকাশ:

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত জুলাই-জুন অর্থবছর পরিবর্তন করে নতুন মেয়াদ নির্ধারণের বিষয়টি নীতি-নির্ধারণী মহলে ঐতিহাসিক রূপান্তরের সূচনা করেছে। সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বর্ষাকালীন অপচয় রুখতে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছরের যে প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, সেটির অন্তর্নিহিত দর্শনে গুরুত্ব দিয়ে সরকার ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন অর্থবছর চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান জুলাই-জুন অর্থব্যবস্থায় দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নানা কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতি বছর অর্থবছরের শেষ দুই মাস অর্থাৎ মে ও জুন মাসে অর্থনৈতিক খাতগুলোতে যে তড়িঘড়ি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের হিড়িক পড়ে, তা দেশের স্থায়ী সুশাসন ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে অন্যতম প্রধান অন্তরায়।

ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশে মে, জুন ও জুলাই মাসে ভারী বৃষ্টিপাত, কালবৈশাখী ঝড় এবং নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিত্যদিনের ঘটনা। বর্তমান অর্থবছর জুনে শেষ হওয়ার কারণে মে-জুন মাসে সরকারি প্রকল্পগুলোর সমাপনী বিল প্রস্তুত ও অর্থ ছাড়ের চাপ সৃষ্টি হয়। আমলাতান্ত্রিক পরিভাষায় একে রসিকতা করে ‘জুন ফিভার’ বা ‘জুন ফাইনাল’ বলা হয়। বছরের প্রথম আট-নয় মাস ধীরগতিতে কাজ চলার পর শেষ দুই মাসে বাজেট ল্যাপস বা বাতিল হওয়া বাঁচানোর জন্য তড়িঘড়ি করে ঠিকাদারদের টাকা দেয়া হয়। এর ফলে বর্ষার প্রবল বৃষ্টির মাঝেই পিচঢালাই, রাস্তা সংস্কার, নদী খনন কিংবা বাঁধ নির্মাণের নাটকীয় আয়োজন দেখা যায়, যা কয়েক সপ্তাহ না যেতেই ধসে পড়ে। নতুন সরকারের গৃহীত এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর কার্যকর হলে মার্চ মাসেই সব রকম হিসাব-নিকাশ শেষ হয়ে যাবে। ফলে এপ্রিল ও মে মাসে বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই দরপত্র প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা যাবে। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত টানা ছয়-সাত মাসের শুষ্ক মৌসুমে প্রকৌশলীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারবেন, যা কাজের গুণগত মান বাড়াবে।

কৃষি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জুলাই-জুন ব্যবস্থায় বোরো ধান কাটার মাঝপথে অর্থবছর শেষ হতো, যা কৃষক পরিবারের হিসাব ও সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাকে দ্বিখণ্ডিত করত। এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালুর ফলে বোরো ও রোপা আমন উভয় কৃষি মৌসুম একটি একক ধারাবাহিক অর্থপঞ্জির আওতায় আসবে। এছাড়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ভারত বহু বছর ধরেই এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর অনুসরণ করে আসছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) বাস্তবায়ন, সীমান্ত শুল্ক নির্ধারণ এবং ভারত থেকে কাঁচামাল আমদানি ও রফতানির হিসাবের ক্ষেত্রে এই সমন্বয় অভূতপূর্ব সুবিধা আনবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য আয়কর ও ভ্যাট আহরণ বড় চ্যালেঞ্জ। জুলাই-জুন ব্যবস্থায় জুন মাসে সব করপোরেট প্রতিষ্ঠান অডিট রিপোর্ট জমা দিলে সরকারি দফতরে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এপ্রিল-মার্চ ব্যবস্থা কার্যকর হলে কোম্পানিগুলোর আর্থিক বর্ষ এবং সরকারের রাজস্ব বছরের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হবে। এছাড়া মার্চ মাসে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তুঙ্গে থাকায় উৎসবভিত্তিক ব্যবসায়-বাণিজ্যের সাথে ভ্যাট আদায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে। বাজেট অধিবেশনের ক্ষেত্রেও মে-জুন মাসের প্রখর তাপ বা দুর্যোগের পরিবর্তে জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসের অনুকূল আবহাওয়ায় সংসদ সদস্যরা বাজেটের ওপর দীর্ঘ ও কার্যকর প্রাক-বাজেট আলোচনা চালাতে পারবেন।

তবে অর্থবছরের মতো বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পরিবর্তন সহজসাধ্য নয়। সরকার ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে ৯ মাসের (১ জুলাই ২০২৭ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৮) একটি অন্তর্বর্তীকালীন অর্থবছর হিসেবে পরিচালনা করার পরিকল্পনা করেছে। পরবর্তীতে ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে ১ এপ্রিল-৩১ মার্চ মেয়াদে নতুন বাজেট কার্যকর হবে। সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জটি দেখা দেবে জিডিপি ও মুদ্রাস্ফীতি গণনায়। বিগত ৫০ বছরের অর্থনৈতিক উপাত্ত জুলাই-জুন ভিত্তির ওপর নির্মিত হওয়ায় ঐতিহাসিক তথ্যের ধারাবাহিকতা সাময়িকভাবে ছিন্ন হবে। এজন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) কৌশলগত সমীকরণ মডেল তৈরি করতে হবে।

অর্থবছর পরিবর্তনকে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, সরকারি ক্রয়ে জটিলতা, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, অর্থ ছাড়ে ধীরগতি, জমি অধিগ্রহণ, দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে নতুন অর্থবছরেও বছর শেষে ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। এছাড়া ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণের ঘাটতি, জ্বালানি সরবরাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো পাঁচটি চ্যালেঞ্জকে একই সাথে এগিয়ে নিতে হবে। জুন ২০২৬-এ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩২.৯ বিলিয়ন ডলার। পরিশেষে, প্রশাসনিক জটিলতা সামলাতে হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে একটি সমন্বিত ‘ন্যাশনাল ট্রানজিশন রোডম্যাপ’ তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যাত্রায় নতুন মাইলফলক হবে।

শেয়ার করুন