দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের তীব্র সঙ্কটে জনজীবন ও শিল্পকারখানা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বুধবার জাতীয় সংসদে দেশের জ্বালানি ও সার পরিস্থিতির এই বিপরীতমুখী চিত্র উঠে আসে। সরকারের পক্ষ থেকে গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুদের দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে কেন সঙ্কট দেখা দিয়েছে, তার কোনো সুস্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন সংসদে সারের মাঠপর্যায়ের সঙ্কটের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি পর্যায়ে ১৩ লাখ টন সার মজুদের কথা বলা হলেও কৃষকরা চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। নির্ধারিত ১,৩৫০ টাকার ইউরিয়া ১,৭০০ থেকে ১,৮০০ টাকায় এবং ১,০৫০ টাকার ডিএপি একই দামে বা তার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ডিলাররা রসিদও দিচ্ছেন না। তিনি রংপুর, রাজশাহী, ঝিনাইদহ, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের মতো কৃষিপ্রধান জেলায় সারের তীব্র সঙ্কটের কথা উল্লেখ করে বলেন, এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের এই সঙ্কট বোঝাতে তিনি রংপুরের সার বরাদ্দের তথ্য তুলে ধরে দাবি করেন, গত অর্থবছরের আগস্টে রংপুরে ১০ হাজার ৫৯০ টন সার বরাদ্দ ছিল, কিন্তু চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র এক হাজার ৮৪৭ টন। তবে কৃষিমন্ত্রী এই তথ্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, রংপুরে ইউরিয়ার ক্ষেত্রে গত বছরের আগস্টে এক হাজার ৫৯০ টনের বিপরীতে চলতি বছর এক হাজার ৮৪৭ টন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া টিএসপির বরাদ্দও গত বছরের এক হাজার ৮২ টনের বিপরীতে চলতি বছর এক হাজার ৮১০ টন হয়েছে এবং ডিএপি ও এমওপির বরাদ্দও কমেনি।
জবাবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দেশে সারের কোনো সঙ্কট নেই বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারি গুদামে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন সার মজুদ রয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি। পথে আরও প্রায় চার লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টন সার রয়েছে। মন্ত্রী সারের এই সঙ্কটকে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ‘কৃত্রিম সঙ্কট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, অনিয়মকারী ডিলারদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং মৃত ব্যক্তিদের নামে সার ডিলারশিপ থাকার বিষয়সহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ধানের মিল ও চালের গুদাম থেকে সার উদ্ধারের ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন।
সার বিতরণে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, নতুন নীতিমালায় প্রতি ইউনিয়ন বা পৌরসভায় তিনজন মাস্টার ডিলার রাখার বিধান রাখা হয়েছে। তবে আখতার হোসেন নতুন ডিলার নিয়োগের চেয়ে কৃষকের হাতে ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল কার্ডভিত্তিক ব্যবস্থার দাবি জানান। তিনি সারের আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় সার কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কটের বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: নুরুল ইসলাম বুলবুল জানান, গত ৯ আগস্ট দেশে তিন হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল, যা গত ৫৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কোনো কোনো এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের কারণে মানুষ কষ্টে আছে। তিনি বলেন, ‘নিছক কথামালার আড়ালে প্রকৃত সত্যকে লুকাতে চাই না।’





