শিক্ষা ও কারিকুলাম সংস্কার: মেধাবিকাশে নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা

প্রকাশ:

একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা, আর সেই মেরুদণ্ডকে মজবুত করার প্রধান হাতিয়ার হলো সময়োপযোগী কারিকুলাম ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা ও পাঠ্যসূচি নিয়ে যে পরিবর্তনের আলাপ শোনা যাচ্ছে, তা জাতির জন্য এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় বন্ধে কঠোর অবস্থান এবং কারিকুলামে যে সংশোধনী আনা হচ্ছে, তা শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে অপরিহার্য।

পরীক্ষায় নকল বা অসদুপায় অবলম্বন কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং এটি একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসকে সমূলে বিনাশ করে। এই ব্যাধি দূর করতে কেবল পরীক্ষার হলে কঠোরতা নয়, বরং শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। নতুন সংস্কারে প্রশ্নপত্রের কাঠামো এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যেখানে কেবল মুখস্থ নির্ভরতা দিয়ে পার পাওয়া সম্ভব নয়। যখন মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীর সৃজনশীল মেধা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে হবে, তখন নকল করার সুযোগ ও প্রয়োজনীয়তা উভয়ই হ্রাস পাবে।

বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে পাঠ্যক্রমকে হতে হবে জীবনমুখী ও দক্ষতানির্ভর। আগের কারিকুলামে তাত্ত্বিক জ্ঞানের আধিক্য থাকলেও ব্যবহারিক প্রয়োগের অভাব ছিল। সংশোধিত কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে পাঠ্যবইয়ের বোঝা কমিয়ে তাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন পদ্ধতিতে কেবল বছরের শেষে একটি বড় পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে সারা বছরের ধারাবাহিক মূল্যায়নকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, যা পরীক্ষার চাপ ও ভীতি অনেকাংশেই কমিয়ে আনবে।

পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে অভিভাবকরা থাকেন। সন্তানের সাফল্য তাদের স্বপ্ন, আর ব্যর্থতা তাদের জন্য গভীর মানসিক আঘাত। অনেক অভিভাবক অজান্তে সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করেন, অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করেন কিংবা নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে দেন। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। সমাধানের জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষকদের সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। অভিভাবকদেরও সন্তানকে চাপ না দিয়ে তার সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করতে হবে।

তবে এই সংস্কার বাস্তবায়নে কিছু প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের শিক্ষার মানের বৈষম্য দূর করতে প্রযুক্তির সুষম বণ্টন প্রয়োজন। এছাড়া ভর্তি নীতিমালা নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগ রয়েছে; ভর্তি প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় এবং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেকেই ভুল পছন্দক্রম দিয়ে ফেলেন। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগও রয়েছে, যা সাধারণ পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট সুবিধা ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে আবেদন প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভর্তি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে, সেই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।

পাশাপাশি অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তনও এখানে বড় ভূমিকা রাখবে- জিপিএ-৫ এর অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে সন্তান কতটা শিখল, সেই বিচারে তাদের উৎসাহিত করতে হবে।

শেয়ার করুন