যশোর সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

প্রকাশ:

চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের আলোচিত নাম মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার রাতে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়। পুলিশ বলছে, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন তিনি।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক জানান, সন্ত্রাসী ইমন চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছিলেন। পুলিশের অভিযানের তথ্য পেয়ে তিনি পুনরায় ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। নাজিমুল হক আরও জানান, ইমনের কাছে দুটি দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে এবং তিনি প্রায়ই আসা-যাওয়া করেন।

ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা ইমনের বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন, যিনি কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ইমন সবার বড়। স্থানীয়দের মতে, ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহী ইমন কাঞ্চননগর থেকে সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে অনুশীলন করতেন। পরে নগরের অক্সিজেনে খালার বাসায় থেকে চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন এবং কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতেন। সাবেক কোচ আমিনুল হকের মতে, বাঁহাতি লেগ স্পিনার হিসেবে ইমনের ভালো সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু ২০২০ সালের পর তিনি খেলা থেকে উধাও হয়ে যান।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারীতে জোড়া খুন এবং চান্দগাঁওয়ে আফতাব হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজীদ থানার একটি দস্যুতার মামলায় কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার হলেও ২২ দিনের মাথায় তিনি জামিনে মুক্তি পান। ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র হাতে ইমনের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ বলছে, তিনি অস্ত্র ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ এবং বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় মোটরসাইকেল ভাড়া ও সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের তথ্যমতে, রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর এইচএসসি পরীক্ষা দেননি ইমন। ২০২০ সালে করোনার পর তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তৈয়বের ঘনিষ্ঠ হয়ে রাজনীতিতে জড়ান। ২০২২ সালে ওমানে যান এবং বছরখানেক পর দেশে ফেরেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং বায়েজীদ বোস্তামী এলাকার আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থান শুরু করেন। সেখানে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ৫ আগস্টের পর অক্সিজেন এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে ইমনের সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নজরে আনে।

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করাই ছিল ইমনের মূল কাজ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বায়েজীদ থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজ উদ্দিনকে ফোন করে তিনি হুমকি দেন, ‘৫০ হাজার পুলিশ নিয়ে থাকলেও ঘরে গিয়ে মেরে ফেলব। তোর ভাইকে যেমন ১০ হাজার মানুষের মাঝখানে গুলি করে মেরেছি।’ এ ছাড়া ‘গুলি করে পুরো শরীর ভোমরার বাসা করে দেওয়া হবে’—এমন হুমকি দিয়ে তিনি চাঁদা দাবি করতেন। ১৩ জুলাই বাকলিয়া অ্যাকসেস রোড এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে, যার দুই দিন আগে মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।

গত শনিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলার সময় সন্ত্রাসের পথ বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ইমন বলেন, ‘আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, না হয় বড়লোক হব। বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে আছি।’ চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, ইমন ফোনে মানুষকে খুব সহজে ভয় দেখাতে পারতেন এবং অস্ত্র চালনায় দক্ষ ছিলেন।

শেয়ার করুন