পুলিশের বিশেষায়িত সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)-এর নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি কর্মপরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই দুই ইউনিটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এবং কর্মকর্তাদের অলস সময় কাটানোর প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদরদপ্তর এই উদ্যোগ নিয়েছে। গত ৭ই জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রস্তাবে এটিইউ’র নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (এসএসইউ)’ করার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের যুক্তি, পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকির প্রেক্ষাপটে আরও বিস্তৃত কাঠামো প্রয়োজন।
পরবর্তীতে ৮ই জুন ডিএমপি কমিশনারের কাছে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে সিটিটিসি’র নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট-ডিএমপি (এসএসইউ-ডিএমপি)’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরবর্তী ধাপে এটিইউ’র নাম ‘স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট (এসআরইউ)’ এবং সিটিটিসি’র নাম ‘স্পেশাল রেসপন্স টিম ডিএমপি (এসআরইউ ডিএমপি)’ করার প্রস্তাব আসে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ইন্টারনাল বৈঠক হলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আপাতত নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে থাকলেও কার্যক্রমে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না-ও আসতে পারে।
সূত্র জানায়, দেশে ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ বেড়ে যাওয়ায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৬ সালে ডিএমপি’র একটি বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি গঠন করে। সিটিটিসি ও এটিইউ’র কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনা রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে এগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগের পাশাপাশি ভুয়া জঙ্গিবিরোধী অভিযান সাজানো, গুম, নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে গুমসংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও এই ইউনিটগুলোর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে এসেছে। তবে পুলিশ নীতি নির্ধারকদের মতে, আধুনিক নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় প্রচলিত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। নতুন নামে পরিচালিত হলে এসব সংস্থা অতীতের বিতর্কিত ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে এসে জনআস্থা পুনর্গঠনে সুবিধা পাবে বলে মনে করছে পুলিশ।
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সিটিটিসি ঢাকা মহানগর এলাকায় এবং ২০১৭ সালে গঠিত এটিইউ সারা দেশে উগ্রবাদ দমনে কাজ শুরু করে। একসময় হলি আর্টিজান হামলার পর কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক অভিযান চালালেও বর্তমান সময়েও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম থেমে নেই। গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটিটিসি ও এটিইউ’র কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেকেই মুখ খুলেছেন। গত শুক্রবার মতিঝিল মেট্রো রেলের নিচে একটি শক্তিশালী টাইমবোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। এছাড়া গত ২৬শে ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাসনাবাদ হাউজিং এলাকার একটি মাদ্রাসা ভবনে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। উদ্ধার উপকরণের মধ্যে রয়েছে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন, নাইট্রিক অ্যাসিড ও ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক। গোয়েন্দা তথ্যে সংসদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার সম্ভাব্য পরিকল্পনার সতর্কবার্তাও রয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, কেবল নাম ও পোশাক পরিবর্তন করে বিতর্কমুক্ত হওয়া কঠিন। তার মতে, মানুষ কাজের পরিবর্তন দেখতে চায়। তিনি ইউনিটের কাজের আইনি ভিত্তি তৈরি, সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন এবং দায়িত্ব পালনকারীদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বারবার নাম পরিবর্তন করলে সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্ব হারাতে পারে।





