আধুনিকতা মূলত যৌক্তিক চিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চার নাম। আজকের বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের সাথে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি নিজস্ব ঐতিহ্যের ভিত্তিপ্রস্তর শক্ত রাখাই প্রকৃত আধুনিক মানুষের পরিচয়। একজন মানুষ যখন তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়, তখনই সে আধুনিক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। কিন্তু বর্তমান সমাজব্যবস্থায় এক ধরনের অস্থিরতা ও পরিচয় হারানোর হাহাকার স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যেখানে অনেকে নিজেদের হাজার বছরের ধর্মীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে ‘সেকেলে’ বা ‘সঙ্কীর্ণ’ বলে অবজ্ঞা করছেন।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, শেকড় নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগার কারণে মানুষ অন্যের পোশাক বা সংস্কৃতিকে নিজস্ব হিসেবে গ্রহণ করার চেষ্টা করে। এই কৃত্রিম আধুনিকতার মোহ মানুষকে মানসিকভাবে নিঃস্ব করে দেয়। বিষয়টি জীবনের শেষপ্রান্তে এসে আরও প্রকটভাবে ধরা দিচ্ছে। ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হলেও, এখন অতি আধুনিক হওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় আচারের বদলে সঙ্গীত পরিবেশন করা হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রথা ও রীতির শৃঙ্খল কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং স্বজনদের মানসিক সান্ত্বনার সেতুবন্ধন। এই বন্ধন শিথিল হওয়া মানে সামষ্টিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়া।
ধর্মের ক্ষেত্রেও অনেকে ‘মর্মার্থ বুঝি, তাই আচারের প্রয়োজন নেই’ এমন দাবি করে নিজের মনগড়া ধর্ম তৈরি করছেন, যা আত্মপরিচয়ের সঙ্কটের অন্যতম কারণ। সমাজবিজ্ঞানী র্যালফ লিংটনের মতে, সংস্কৃতি কেবল নাচ-গান বা চারুকলা নয়, বরং এটি একটি জীবনধারা ও অভ্যস্ত আচরণের সমষ্টি, যা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রভাব ফেলে। পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থা সংস্কৃতিকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে, ফলে মানুষ সংস্কৃতির দার্শনিক ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে কেবল বাহ্যিক রূপটি আঁকড়ে ধরছে। দাফন-কাফনের মতো রীতিনীতি বিশ্বাসের সংস্কৃতির প্রতিফলন, যা সঙ্গীত বা অন্য কোনো প্রথা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা আসলে সাংস্কৃতিক সঙ্করায়ণ।
ইসলামী ঐতিহ্যে জানাজার নামাজ, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত ও সবরের মতো বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট। দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে মৃত্যুর পর সঙ্গীত পরিবেশনের কোনো নজির নেই এবং শরিয়াহর দৃষ্টিতে এটি ‘বিদআত’ হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা থেকে প্রার্থনার মতো মনে করে মৃতব্যক্তিকে সামনে রেখে তা পরিবেশন করেন, যা মূলত ধর্মীয় প্রথাকে প্রতিস্থাপনের একটি সচেতন প্রয়াস।
সমাজের বড় এক বিস্ময় হলো, প্রগাঢ় ধার্মিক ও বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বদের সন্তানদের একাংশের নাস্তিক্যবাদের দিকে ধাবিত হওয়া। অনেক সময় সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থায় বড় হওয়ার ফলে অর্জিত দর্শন ও পারিবারিক ধর্মীয় আদর্শের মধ্যে বড় ধরনের গ্যাপ তৈরি হয়। এছাড়া বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সমাজতন্ত্র ও উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রভাবও তরুণ প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে ধর্মীয় জগতকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধুনিক সংবেদনশীলতার সাথে উপস্থাপন করতে না পারাও এই ট্র্যাজেডির অন্যতম কারণ।
পরিশেষে, আধুনিকতা মানে অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং নিজ সংস্কৃতির পরিশীলন। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঐতিহ্যের সৌন্দর্য তুলে ধরার মাধ্যমেই এই সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব। শেকড়হীন বৃক্ষ যেমন ঝড়ে উপড়ে যায়, তেমনি ঐতিহ্যহীন সমাজও স্থায়িত্ব হারায়। নিজস্ব ধর্মীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি ঠিক রেখে সময়ের দাবি অনুযায়ী পরিশীলতা আনাই প্রকৃত আধুনিকতা।





