চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ও আইনগতভাবে ব্রেন ডেথ বা মস্তিষ্কের মৃত্যু ঘটা মানেই একটি জীবনের সমাপ্তি। হাসপাতালের করিডরে স্বজনদের কান্নার রোল পড়ে যাওয়া এমন এক পরিস্থিতিতে সাধারণত জীবনের সব আশা শেষ হয়ে যায়। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে এমন অসম্ভব মনে হওয়া ঘটনাও বাস্তবে সম্ভব হয়েছে। যদি কোনো অন্তঃসত্ত্বা মায়ের ব্রেন ডেথ হয় কিন্তু তাঁর গর্ভের ভ্রূণ জীবিত থাকে, তবে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় সন্তান প্রসবের আগপর্যন্ত মাকে যান্ত্রিকভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।
এই বিশেষ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরা ভেন্টিলেটর, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে মায়ের শরীরকে সাময়িকভাবে কার্যকর রাখেন। ভ্রূণ পর্যাপ্ত পরিণত হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে এবং পরবর্তীতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর জন্ম দেওয়া হয়। ২০২১ সালে ‘আমেরিকান জার্নাল অব অবস্টেকট্রিক অ্যান্ড গাইনোকলজি’-তে প্রকাশিত একটি সিস্টেম্যাটিক রিভিউয়ে বিশ্বের প্রায় ৩৫টি এমন ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে যথাযথ নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে জীবিত শিশুর জন্ম সম্ভব হয়েছে।
ইতিহাসে এমন বিরল ঘটনার নজির রয়েছে। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ বছর বয়সী সুসান টরেস নামের এক নারী স্ট্রোকের কারণে ব্রেন ডেথ হওয়ার সময় ১৭ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরের কার্যক্রম লাইফ সাপোর্টের মাধ্যমে চালু রাখেন এবং গর্ভকাল নিরাপদ পর্যায়ে পৌঁছালে সিজারিয়ান পদ্ধতিতে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। শিশুটির জন্মের পর মায়ের লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া চেক প্রজাতন্ত্রে আরও একটি ঘটনায় মায়ের ব্রেন ডেথ নিশ্চিত হওয়ার পর প্রায় ১১৭ দিন তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘতম সফল সোমাটিক সাপোর্টের অন্যতম উদাহরণ।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রগতির পাশাপাশি প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিকতা, পরিবারের মতামত এবং আইনি বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। ব্রেন ডেথ থেকে ফিরে আসার কোনো বৈজ্ঞানিক নজির নেই, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে নিভে যাওয়া একটি জীবনের মধ্য থেকেও নতুন একটি জীবনের জন্ম দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, যা আমাদের ধারণার বাইরের এক বিস্ময়কর বাস্তবতা।




