সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যে পরিমাণ বরাদ্দ পান, বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা তার তিন ভাগের এক ভাগও পান না বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। শনিবার বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর করা, সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধ এবং জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করে ১১ দলীয় ঐক্য।
নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে রংপুরের প্রতি বাজেট বৈষম্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে রংপুরে কোনো বড় উন্নয়ন প্রকল্প রাখা হয়নি, বরং সব বরাদ্দ বগুড়ার শিবগঞ্জে চলে যাচ্ছে। তার দাবি, গোপালগঞ্জকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বগুড়ার শিবগঞ্জে, অথচ প্রকৃত বৈষম্যের শিকার রংপুরবাসী কোনো বরাদ্দ পাচ্ছে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, রংপুর বিভাগ দীর্ঘকাল ধরে আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত সরকারের প্রথম বাজেটে রংপুর বিভাগের প্রতি সুদৃষ্টি আশা করা হলেও, বেশির ভাগ আসন বিরোধী দলের হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরকে ‘অর্জন শূন্য’ বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। তিনি বলেন, সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো হলেও, চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
নাহিদ ইসলাম দেশের জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, জাতীয় ঐক্য না থাকলে তারেক রহমান পৃথিবীর কোনো দেশ থেকে সাহায্য পাবেন না। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতিমধ্যেই সরকারকে আর কোনো ঋণ দেবে না বলে জানিয়েছে। তার মতে, গণঅভ্যুত্থান ও সংস্কারের সঙ্গে প্রতারণা করলে কোনো দেশই সহযোগিতা করবে না।
বিএনপির বিরুদ্ধে গণভোট ও সংস্কারের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ এনে নাহিদ ইসলাম বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ রংপুর থেকে গণঅভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছিল এবং এর সিপাহসালার ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর বিএনপি গণভোটের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছিল এবং সেই সরকারের মাধ্যমেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু ক্ষমতায় এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অস্বীকার করে। এর ফলস্বরূপ বিএনপিকে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে রাজপথে নির্যাতিত হতে হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গণঅভ্যুত্থান, গণভোট, সংস্কার ও জুলাই সনদের কারণে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও, তারা গণভোট, ৩১ দফা, জুলাই সনদ এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ নেই এবং গ্রামেগঞ্জে মানুষ আবার হারিকেন জ্বালাতে বাধ্য হচ্ছে। এই সরকার আগেও হারিকেন দিয়েছে এবং এবারও মানুষের হাতে হারিকেন ধরিয়ে দিয়েছে। বিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থান দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই বাজেটে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা নেই। ব্যাংকগুলো কীভাবে ঠিক হবে বা দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা কীভাবে ফেরত আসবে, সে বিষয়ে সরকারের কোনো সুপরিকল্পনা নেই। তিনি তারেক রহমানের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি এভাবে দেশ চালাতে পারবেন না। দেশ চালাতে অলরেডি ব্যর্থ হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছেন। সংস্কার দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তারেক রহমানের প্রতি অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক সংস্কার, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সীমান্তে পুশইন ও সীমান্ত হত্যা প্রতিরোধের দাবি জানান। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যদি সীমান্ত হত্যা ও পুশইন প্রতিরোধ করা না যায়, তাহলে নিজেদের দল থেকে ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটি কেটে ফেলা উচিত। তার মতে, জাতীয়তাবাদের নামে ব্যবসা করে নিজেদের দেশপ্রেমিক দেখালেও সীমান্ত হত্যা রোধ করতে না পারলে দেশের জনগণ তাদের ক্ষমতায় থাকার ম্যান্ডেট দেবে না।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ডিসেম্বরে কেউ একজন দেশে আসার পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ফাঁসির দঁড়ি রেডি করে অপেক্ষা করছি। আপনি (শেখ হাসিনা) ডিসেম্বরে আসুন আর যখনই আসুন, ফাঁসির দঁড়িতে ঝুলতেই হবে।’ তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে যে পালিয়ে যায়, সে আর কখনো ফিরে আসে না। পাকিস্তানি ও ইংরেজরাও এর চেয়ে সম্মানজনকভাবে বিদায় নিয়েছিল, কিন্তু শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকার অসম্মানজনক ও কাপুরুষোচিতভাবে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতের কোলে আশ্রয় নিয়েছে। তার মতে, শেখ হাসিনা আর এই দেশে আসার সৎ সাহস কখনো রাখবেন না। নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা আসবে কি আসবে না, তা দিল্লি ও ঢাকাকে নির্ধারণ করতে হবে এবং এই সরকার থেকে দিল্লিকে বার্তা দিতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন এবং ফ্যাসিবাদী মিডিয়ার দোসররা সেই তথ্য প্রচার করছে, যা বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না।
নাহিদ ইসলাম জানান, সংস্কার, গণভোট, জুলাই সনদসহ ১১ দলীয় ঐক্যের দাবি বাস্তবায়নে অচিরেই নতুন করে আন্দোলনের ডাক আসবে। প্রায় ১০ মিনিটের বক্তব্য শেষ করার সময় তিনি সেই আন্দোলনে সফল হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলী আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন বক্তব্য দেন। এছাড়াও, সমাবেশের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির এটিএম আজম খান, সেক্রেটারি কে এম আনোয়ারুল হক কাজল, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রংপুর জেলা আহ্বায়ক আল মামুন, মহানগরের সদস্য সচিব আব্দুল মালেকসহ ১১ দলীয় ঐক্যের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।





