খেলাপি ঋণ কমাতে ২৯ ব্যাংকের ওপর বিশেষ নজরদারি বাংলাদেশ ব্যাংকের

প্রকাশ:

ব্যাংকিং খাতের লাগামহীন খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে এবার কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা ২৯টি ব্যাংককে সরাসরি বিশেষ নজরদারির আওতায় নিয়ে এসেছে। এসব ব্যাংককে ঋণ আদায়ে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে ২৩টি ব্যাংককে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ২০ শতাংশের নিচে এবং বাকি ছয়টি ব্যাংককে ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের হার কমানো নয়, বরং দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণ আদায়, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, ব্যাংকের ঋণ আদায় সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি রোধ করা। এই লক্ষ্য অর্জনে উচ্চ খেলাপি থাকা ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সাথে নিয়মিত বৈঠক, শীর্ষ খেলাপিদের আদায় অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ব্যাংকভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশের খেলাপি ঋণ সীমিতসংখ্যক ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। এর ফলে এসব ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ দেয়ার সক্ষমতা চাপের মুখে পড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে উচ্চ খেলাপি থাকা ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহী ও ঋণ আদায় বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার শুধু ব্যবস্থাপনার অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে না দেখে, পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং অডিট, নির্বাহী ও রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটির প্রধানদের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে পর্ষদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য দেয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। এক্ষেত্রে শুধু পুনঃতফসিলের ওপর নির্ভর না করে প্রকৃত নগদ আদায় ও ঋণের কার্যকর নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। অতীতে বারবার পুনঃতফসিল বা কাগুজে সমন্বয়ের মাধ্যমে হার কম দেখানোর অভিযোগ ছিল, যা এবার পরিহার করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশলের অংশ হিসেবে বিশেষ ‘এক্সিট’ সুবিধাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। গত ২৯ জুন এ সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে আর্থিক সঙ্কটে পড়া সম্ভাবনাময় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে এককালীন অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তবে এই সুবিধা যেন ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দায়মুক্তির পথ না হয়, সে বিষয়ে কঠোর যাচাইয়ের নির্দেশনাও রয়েছে।

ভবিষ্যতে নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি ঠেকাতে অগ্রিম পদক্ষেপ হিসেবে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা বা সিআরএমজি হালনাগাদ করা হচ্ছে। ঋণ দেয়ার আগে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ এবং জামানতের প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য আইনি ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ সংশোধন এবং খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৬-এর খসড়া চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংক কতটা কঠোরভাবে ব্যাংকগুলোর কর্মপরিকল্পনা মনিটর করে তার ওপর। প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যাংকগুলোর অনীহা এবং রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব কাটিয়ে প্রকৃত অর্থ আদায় নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার করুন