বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি হোক সমমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থ

প্রকাশ:

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর এমন এক সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন দুই দেশের সম্পর্ককে চিরাচরিত আবেগের বৃত্ত থেকে বের করে পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা ও জবাবদিহির কাঠামোর ওপর স্থাপন করা প্রয়োজন। ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পরীক্ষিত সহায়ক হলেও, পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা রয়েছে। এই সফর কেবল সৌজন্যের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও পরিমাপযোগ্য জাতীয় অর্জনের পথে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ হওয়া জরুরি।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, আমাদের পূর্বপুরুষরা আধুনিক অর্থে ভারতীয় নাগরিক ছিলেন না; তারা ছিলেন বঙ্গীয় জনপদের মানুষ। ত্রয়োদশ শতকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয় এবং পরবর্তীতে সুলতানি ও মোগল আমলে ভাষা, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের সমৃদ্ধি ঘটে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আমাদের বহুমাত্রিক পরিচয় দিয়েছে—ধর্মে মুসলমান, ভাষা ও সংস্কৃতিতে বাঙালি, এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে বাংলাদেশী। আমাদের জাতীয়তাবাদ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ সব নাগরিকের সমান অধিকারের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। জাহাঙ্গীরের দরবারে ১৬১৫ সালে স্যার টমাস রো বাণিজ্যিক সুবিধা চেয়েছিলেন; কোম্পানি সেই সুযোগকে পরে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ দেয়।

১৭৫৭ সালের পলাশীর বিপর্যয় আমাদের শিক্ষা দেয় যে, অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানই বিদেশী প্রভাবের পথ প্রশস্ত করে। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অসাধারণ মানবিক অবদান এবং আশ্রয় ও সামরিক সহযোগিতার কথা আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি, কিন্তু এই কৃতজ্ঞতা কোনো রাষ্ট্রকে স্থায়ী রাজনৈতিক আনুগত্যে আবদ্ধ করতে পারে না। বন্ধুত্ব তখনই টেকসই হয়, যখন উভয় দেশ সমান সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক লাভকে মানদণ্ড করে। গঙ্গার পানিচুক্তি, স্থলসীমান্ত চুক্তি ও সমুদ্রসীমার শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি প্রমাণ করেছে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কঠিন সমস্যার সমাধান সম্ভব।

বর্তমানে তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা, অনিয়মিত পুশইন এবং অশুল্ক বাণিজ্যিক বাধা আস্থার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর শেখ হাসিনার শাসনের প্রতি দিল্লির নীতিগত সমর্থন বাংলাদেশের মানুষের বড় অংশে এই ধারণা তৈরি করেছে যে, ভারত জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার চেয়ে নির্দিষ্ট একটি সরকারকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল বৈষম্য ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে নাগরিক মর্যাদার বিস্ফোরণ। ২০২৬-এর সরকারকে এই আকাঙ্ক্ষা পররাষ্ট্রনীতিতেও বাস্তবায়ন করতে হবে সাহসী ভাষায়, পেশাদার প্রস্তুতিতে এবং দৃশ্যমান ফলাফলে।

কূটনৈতিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে, সফর হওয়া উচিত সুপরিকল্পিত এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক। আমি প্রধানমন্ত্রী হলে ১১ সেপ্টেম্বর দিল্লি যেতাম, ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের একদিন আগে। ১২-১৩ সেপ্টেম্বর বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নিতাম। এতে ১৯৭১ সালে ভারতের অবদানের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, নিকট প্রতিবেশীর সাথে ন্যায্য সহযোগিতার সদিচ্ছা এবং দূরবর্তী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সাথে বহুমুখী অংশীদারত্বের বার্তা একসাথে পৌঁছাত। অভিন্ন জাতীয় অবস্থান নিয়ে প্রধান বিরোধী দলগুলোর মনোনীত জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সাথে নিতাম, যাতে দিল্লি ও ভারতের জনগণ দেখেন- ভারতনীতি কোনো দলের সম্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নীতি। এছাড়া তিস্তা পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং বাণিজ্য ঘাটতি নিরসনে নির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সীমা থাকা আবশ্যক। প্রতিটি সমঝোতার অগ্রগতি ছয় মাস অন্তর প্রকাশ্য পর্যালোচনা করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত।

বাংলাদেশের কূটনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরোধিতা বা নির্ভরতার মধ্যে আটকে থাকবে না। আমরা ভারতের ন্যায্য উদ্বেগ শোনার পাশাপাশি নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকব এবং চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ অন্যান্য বিশ্বশক্তির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখব। দিল্লি সফরের সার্থকতা কোনো ছবির ফ্রেমে নয়, বরং বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করবে। সমমর্যাদার প্রতিবেশিতা এবং জনগণকেন্দ্রিক সহযোগিতাই হোক নতুন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি।

শেয়ার করুন