জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধানে

প্রকাশ:

পৃথিবী আজ খণ্ডবিখণ্ড এবং মানুষ তাদের ইচ্ছা ও শক্তির জোরে বিশ্বকে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। যার ক্ষমতা যত বেশি, সে তত বেশি আধিপত্য বিস্তার করে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই 'জাতীয়তাবাদ' নামক তত্ত্বের উদ্ভব, যা রাষ্ট্র গঠন, টিকিয়ে রাখা কিংবা ভেঙে দেওয়ার পেছনে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে। জাতীয়তাবাদ মূলত একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস, যা জাতি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে এবং একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে জনগণের বসবাসের নিশ্চয়তা দেয়।

ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছিল ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়ন যুগে, যেখানে ভাষা ও সংস্কৃতি রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত হয়। এটি জার্মানি ও ইতালির মতো রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করলেও অস্ট্রো-হাঙ্গেরি বা অটোমান সাম্রাজ্যের মতো বহুজাতিক কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষাপটও অনেকাংশে একই ধরনের, যা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। যদিও আপাতদৃষ্টিতে একে সাংস্কৃতিক ও ভাষাভিত্তিক মনে হতে পারে, তবে বাস্তবে এর রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী।

বাঙালির জাতিভাবনার উন্মেষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে শুরু হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যে দেশমাতৃকার প্রতি ভক্তি ও শক্তির যে সমন্বয় দেখা যায়, তা স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তবে তার জাতীয়তাবাদকে অনেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ হিসেবে চিহ্নিত করেন। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংকীর্ণ জাত্যভিমানকে প্রত্যাখ্যান করে জাতীয়তাবাদকে সর্বজনীন মানবতার সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে ছিলেন। ভারতভাগের পর হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিপরীতে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও তা বেশি দিন অখণ্ড থাকেনি।

১৯৪৭ সালের পর পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ক্ষোভ থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জোরালো উত্থান ঘটে। ১৯৪৮-৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তিনটি মূল স্লোগান—'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা', 'তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি' এবং 'জয় বাংলা'—এই অঞ্চলের মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল। এই আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে।

১৯৭২ সালের সংবিধানে বাঙালি পরিচয়কে জাতিসত্তার ভিত্তি করা হয়। কিন্তু ভৌগোলিক সীমানার বাইরেও কোটি কোটি বাংলাভাষী মানুষের উপস্থিতি থাকায় এই পরিচয়ের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক পরিচয় বা 'বাংলাদেশি' সত্তা বড় কি না, তা নিয়ে ১৯৭৫ সালের পর থেকে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার হিসেবে দেখলেও বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তি করেছে। এই দুই মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের অন্যতম কারণ।

শেখ মুজিবুর রহমানকে 'জাতির পিতা' হিসেবে আখ্যায়িত করা নিয়েও রাজনৈতিক ভিন্নমত রয়েছে। বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে হলেও বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাস হাজার বছরের। এ ধরনের পিতৃতান্ত্রিক ধারণা ও রাজনৈতিক বিভাজন ৫৫ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ার করুন