চৌধুরী রহমত আলী দক্ষিণ এশিয়ায় ১০টি নতুন মুসলিম রাষ্ট্রের একটি কমনওয়েলথ গঠনের মাধ্যমে অখণ্ড ভারত ও রামরাজ্যের পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে চেয়েছিলেন। তার চিন্তাধারাকে অনেকে অবাস্তব মনে করলেও, তিনি মূলত ভারতীয় সংসদে ঝোলানো অখণ্ড ভারতের মানচিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। মোদি সরকার আরএসএসের আদর্শ অনুযায়ী পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়া দখল করে এখানকার মুসলমান, খ্রিষ্টান ও শিখদের জোরপূর্বক হিন্দু বানাতে চায়।
নতুন প্রদেশ গঠন নিয়ে এক বন্ধুর সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতে লেখক জানান, তিনি নতুন প্রদেশ গঠনের বিরোধী নন, তবে তা ১৯৭৩ সালের সংবিধানের ২৩৯ ধারার উপধারা ৪ অনুযায়ী হতে হবে। যে প্রদেশের অ্যাসেম্বলি নতুন প্রদেশের পক্ষে রায় দেবে, সেখানেই তা গঠন করা উচিত। মুসলিম লীগের (এন) একজন মন্ত্রী জানান, তারা জাতীয় স্বার্থেই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নতুন প্রদেশ গঠনের পথ খুঁজছেন। তবে লেখক সতর্ক করেন যে, নতুন প্রদেশ গঠনের সময় সিন্ধু ও পাঞ্জাবের মতো প্রদেশগুলোর পরিচয় কেড়ে নেয়া উচিত নয়, কারণ ‘পাকিস্তান’ শব্দটি মূলত পাঞ্জাব, আফগানিয়া (খায়বারপাখতুনখাওয়া), কাশ্মির, সিন্ধু এবং বেলুচিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করে।
‘পাকিস্তান’ শব্দটি নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে লেখক জানান, গোলাম হাসান শাহ কাজেমি নামের এক কাশ্মিরি সাংবাদিক ১৯২৮ সালে সাপ্তাহিক পাকিস্তান নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি চেয়ে অ্যাবোটাবাদের ডেপুটি কমিশনারের কাছে আবেদন করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৩৩ সালে চৌধুরী রহমত আলী তার ‘Now Or Never’ (এখন, নতুবা কখনোই নয়) পুস্তিকায় এই শব্দটিকে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে ব্যবহার করেন। শুরুতে এটি ছিল ‘PAKSTAN’, পরে ইসলামের প্রতিনিধিত্বের জন্য এতে ‘i’ যুক্ত হয়ে ‘PAKISTAN’ হয়। রহমত আলী ‘পাকস্তান’-এ দিল্লিসহ পুরো পাঞ্জাব, আফগানিয়া, কাশ্মির, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এবং বাংলা ও আসামের জন্য ‘বঙ্গস্তান’-এর প্রস্তাব করেছিলেন। ২৩ মার্চ, ১৯৪০ সালের অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাবে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি ছিল না; সেখানে একাধিক রাষ্ট্র গঠনের দাবি ছিল। ১৯৪৬ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলাকে পাকিস্তানে যুক্ত করার ঘোষণা দেন, যাকে ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ হলেও ১৯৭১ সালে তা বাংলাদেশ হিসেবে আলাদা হয়ে যায়।
লেখক উল্লেখ করেন, সিন্ধু অ্যাসেম্বলি ১৯৪৩ সালে এবং পাঞ্জাব অ্যাসেম্বলি ২৩ জুন, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের পক্ষে রায় দিয়েছিল। নতুন প্রদেশ গঠনের ক্ষেত্রে ভারতের উদাহরণ দেয়া ঠিক নয়, কারণ ভারতের জনসংখ্যা ও পাকিস্তানের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের জনসংখ্যা ২৪ কোটি, বিহারের ১৩ কোটি ও মহারাষ্ট্রের ১২ কোটি। বিপরীতে পাকিস্তানের পাঞ্জাবের জনসংখ্যা ১২ কোটির বেশি এবং সিন্ধুর প্রায় ছয় কোটি। দুই প্রদেশ খায়বারপাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানের অবস্থা খারাপ এবং আজাদ কাশ্মিরেও বিশৃঙ্খলা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো পদক্ষেপ নেয়া উচিত নয় যা পাকিস্তানের শত্রুদের সিন্ধুতে ঘৃণার আগুন জ্বালানোর সুযোগ করে দেয়।
চৌধুরী রহমত আলীর পরিকল্পনায় ভারতের পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯১১ সালে লেখা ভারতের জাতীয় সঙ্গীতে আজও ‘সিন্ধু’ শব্দটি রয়েছে, যা অখণ্ড ভারতের পুরনো পরিকল্পনারই অংশ। রহমত আলী পাকিস্তান ও বঙ্গস্তান ছাড়াও হায়দারস্তান (আগ্রা, অযোধ্যা), ফারুকস্তান (বিহার, উড়িষ্যা), সিদ্দিকস্তান (মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র), মুঈনস্তান (রাজস্থান), উসমানস্তান (দাক্ষিণাত্য), মাপ্লস্তান (মালাবার, মাদ্রাজ), সফস্তান (পূর্ব শ্রীলঙ্কা), নিসারস্তান (পশ্চিম শ্রীলঙ্কা) এবং শিখদের জন্য ‘সিখিয়া’ বা ‘সিখস্তান’ (পাটিয়ালা, নাভা, ফরিদকোট) ও হিন্দুদের জন্য ‘হিন্দুস্তান’-এর পরিকল্পনা করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ ও জম্মু-কাশ্মির ছাড়া পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় রহমত আলীর তীব্র আপত্তি ছিল। আজকের ভারতে মুসলমানদের পরিস্থিতির আলোকে তার চিন্তাধারা পুনরায় আলোচনার দাবি রাখে।





