বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকটের কারণ ও সমাধানের পথ খুঁজছে সরকার

প্রকাশ:

বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা পাঁচ কোটির বেশি, যার মধ্যে তিন কোটি ৭১ লাখই পল্লী বিদ্যুতের আওতাভুক্ত। লোডশেডিংয়ের কারণে এই বিপুল সংখ্যক গ্রাহক বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামে লোডশেডিংয়ের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। কিছু এলাকায় ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে বা এখনো হচ্ছে। সাভারের এক গ্রাহক রোজিনা জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পাশাপাশি বিদ্যুতের কার্ড রিচার্জের খরচও তাদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও রফতানিমুখী শিল্পকারখানাও বিদ্যুৎ সংকটে ধুঁকছে। গ্যাস সংকটের কারণে ক্যাভটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো ঠিকমতো চলতে পারছে না। গাজীপুরের এক কারখানা মালিকের মতে, ডিজেল জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন সচল রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যার ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। অনেক কারখানা বাধ্য হয়ে উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সময়মতো পণ্য শিপমেন্ট করতে না পারায় বিদেশি বায়ারদের কাছ থেকেও অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।

বিদ্যুৎ সংকটের জেরে বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনসহ গোপালগঞ্জ ও নীলফামারীর মতো জেলার বিদ্যুৎ অফিসগুলো পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে সহায়তা চেয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ হাজার মেগাওয়াট, যার মধ্যে গ্রিড পর্যায়ে সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। চলতি বছরের মে মাসে ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড হলেও, ১০ আগস্ট একদিনে সর্বোচ্চ তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের রেকর্ডও হয়েছে। সরকার বলছে, এলএনজি আমদানিতে সংকট এবং প্রাথমিক জ্বালানির সীমাবদ্ধতাই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। প্রধানমন্ত্রী এই সংকটের জন্য জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিগত সরকারের সময় আমদানি নির্ভরতা বাড়ানো এবং ব্যয়বহুল জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে অতি গুরুত্ব দেওয়াই আজকের সংকটের মূল কারণ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কয়লাভিত্তিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্পগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলমের মতে, বিদ্যুৎ খাতকে সেবা হিসেবে না দেখে মুনাফাভিত্তিক করার ফলেই এই কাঠামোগত সংকট তৈরি হয়েছে।

সমাধানের উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের পূর্ণ ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, ডিজেল সেচ থেকে সৌর সেচে স্থানান্তর এবং রিজিওনাল গ্রিড সক্রিয় করার পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে আদানির সাথে চুক্তির ট্যারিফ কমানো বা আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

শেয়ার করুন