ইয়াবার ভয়াবহ থাবায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, নিয়ন্ত্রণে হিমশিম কর্তৃপক্ষ

প্রকাশ:

মেথামফেটামিনযুক্ত উত্তেজক মাদক ইয়াবা, যা ‘ক্রেজি পিল’ নামেও পরিচিত, বর্তমানে বাংলাদেশে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। দেশজুড়ে মাদকের এই বিস্তার কেবল আসক্তির সংকটই বাড়াচ্ছে না, বরং এটি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযানে কিছু সাফল্য অর্জিত হলেও মাদকের এই ব্যাপক ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

ইয়াবা মূলত মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনসহ অন্যান্য ভেজাল উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি এক ধরনের শক্তিশালী ট্যাবলেট। এটি অত্যন্ত দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। ব্যবহারকারীরা সাধারণত ট্যাবলেট গুঁড়ো করে ধূমপানের মাধ্যমে অথবা সরাসরি গিলে এটি সেবন করেন। থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ ‘পাগলের বড়ি’ বা ‘ক্রেজি পিল’। দ্য উইক-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মাদক বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষকে আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সেবনের ফলে সাময়িকভাবে কর্মশক্তি ও সতর্কতা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে এটি হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া অতিরিক্ত ব্যবহারে সন্দেহপ্রবণতা, মানসিক বিকার, খিঁচুনি, হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা এমনকি মৃত্যুর মতো ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ইয়াবার একটি বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে এই মাদকের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীভূত। ঢাকাভিত্তিক একটি ইংরেজি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, মিয়ানমারের বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশি পণ্যের আংশিক মূল্য পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ ব্যবহার করছে। মাছ ধরার নৌকায় করে পণ্য পাঠানোর সময় ওই একই নৌকায় মাদক নিয়ে আসার মতো ঘটনাও ঘটছে। সীমান্তবর্তী দুর্গম ও নিয়ন্ত্রণহীন এলাকাগুলো মাদক পাচারের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রবেশের পর ইয়াবার একটি অংশ স্থানীয়ভাবে বিক্রি ও সেবন করা হলেও, কিছু চালান ওমান, সৌদি আরব ও দুবাইয়ের মতো দেশেও পাচার করা হয়।

২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সমাজকর্মী আদনান জোবায়েরের মতে, অন্যান্য মাদকের তুলনায় ইয়াবা সস্তা এবং পরিবহন করা অত্যন্ত সহজ হওয়ায় এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট ও নানাবিধ দুর্ভোগও ইয়াবার প্রতি তাদের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

মাদক দমনে সরকার ২০১৮ সালে ইয়াবা রাখার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে গত বছর ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১টি এবং ২০২৪ সালে ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫১টি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে জব্দের পরিমাণ ৯০ দশমিক ৫৮ শতাংশ বাড়লেও, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী জঙ্গলে থাকা উৎপাদন শিবিরগুলো থেকে অবিরাম গতিতে মাদক আসা অব্যাহত রয়েছে। ফলে কেবল অভিযান চালিয়ে এই নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ার করুন