গ্যাসের তীব্র সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ায় বুধবার থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে দেশের শত শত শিল্প-কলকারখানা অচল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাবে লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী এখন কর্মহীন। শিল্পমালিকরা চরম বিপাকে পড়েছেন এবং রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো বায়ারদের অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। শিল্প-কারখানার জন্য বরাদ্দকৃত গ্যাসের বড় একটি অংশ বুধবার থেকে পাওয়ার প্ল্যান্টে সরিয়ে নেওয়ায় পুরো শিল্প সেক্টর এই মহাসংকটে পড়েছে। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত সমাধান না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ পুরো অর্থনীতি ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে।
বর্তমানে সংকট নিরসনের কোনো স্পষ্ট আভাস পাওয়া যাচ্ছে না এবং সরকারের পক্ষ থেকেও আশ্বস্ত হওয়ার মতো কোনো প্রতিশ্রুতি মেলেনি। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, বিগত সরকারগুলোর ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত জাতিকে দিতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংকট সমাধানের জন্য রাতদিন কাজ করছেন এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত টেকসই সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তবে রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলছেন, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির চাকা থমকে যাবে এবং মালিকদের পক্ষে ব্যাংকের দায়-দেনা পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, তারা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। তিতাস গ্যাস স্বাভাবিক করতে এক সপ্তাহ ধরে চেষ্টা চলছে। মন্ত্রী ১০ তারিখের পর গ্যাস স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দিলেও বর্তমানে গ্যাস একদমই নেই। রোববার মন্ত্রীর সঙ্গে বসার চেষ্টা চলছে, সমাধান না হলে সোমবার সংবাদ সম্মেলন করা হবে।
হবিগঞ্জে জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে গ্যাস সরবরাহ কমতে শুরু করে এবং বুধবার থেকে ১৭১টি ছোট-বড় কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের তীব্র সংকটে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যা রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় ধাক্কা। সাভার-আশুলিয়ার প্রায় দেড় হাজার কারখানার মধ্যে গ্যাসনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে। সেখানে উৎপাদনের জন্য ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৮ পিএসআই। স্থানীয় শ্রমিক নেতাদের দাবি, চলতি মাসে উলাইল, হেমায়েতপুর ও আশুলিয়ার ৩০০টির বেশি কারখানায় দুই হাজারের বেশি শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। এর মধ্যে আশুলিয়ার অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিট লিমিটেডেই চলতি সপ্তাহে ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসায় প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ডায়িং থেকে কাপড় না পাওয়ায় শতাধিক গার্মেন্টসও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শহরের একটি গার্মেন্টসে ১৫০০ শ্রমিক অলস বসে আছেন। এছাড়া নরসিংদীর একটি স্পিনিং মিলে জেনারেটর বন্ধ থাকায় ১২০০ শ্রমিকের কাজ বন্ধ হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের প্রায় সবই বন্ধ রাখতে হচ্ছে, ফলে চালকদের দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত সমাধান না হলে অর্ডার বাতিল হবে এবং রপ্তানি আয় কমবে।





