৫০ বছরের লড়াই শেষে বেজিমুক্ত হলো জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপ

প্রকাশ:

পরিবেশের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রে বহিরাগত কোনো প্রাণীর অনুপ্রবেশ যে কতটা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, ১৯৭৯ সালের জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপের ঘটনা তার এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। সেই বছর কাগোশিমা প্রশাসনিক অঞ্চলের অধীন এই সবুজ-শ্যামল দ্বীপে বিষাক্ত ‘হাবু’ সাপের উপদ্রব কমানোর উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ৩০টি ক্ষুদ্র ভারতীয় বেজি আনা হয়েছিল। পরিকল্পনাকারীদের ধারণা ছিল, সাপের প্রাকৃতিক শিকারি হিসেবে বেজি নামিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রকৃতি ভিন্ন চিত্র দেখাল।

সাপ ও বেজির জীবনযাত্রার সময়সূচির বিষয়টি পরিকল্পনার সময় গুরুত্ব পায়নি। বেজি দিনের আলোতে খাবার খোঁজে, অথচ হাবু সাপ সম্পূর্ণ নিশাচর। ফলে সাপ নিধনের পরিবর্তে মাত্র ৩০টি বেজি পুরো দ্বীপের বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ২০০০ সালের মধ্যে দ্বীপটিতে বেজির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৯৩ সাল থেকে স্থানীয়ভাবে এবং ২০০০ সাল থেকে জাতীয়ভাবে বেজি নির্মূল অভিযান শুরু করে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়। ৭১২ বর্গকিলোমিটারের এই ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ দ্বীপে প্রায় ৩০ হাজার ফাঁদ ও সেন্সর ক্যামেরা বসানো হয়। স্থানীয়দের নিয়ে ‘আমামি মঙ্গুস বাস্টার্স’ নামে একটি বিশেষ ট্রাস্কফোর্স গঠন করা হয়। দীর্ঘ এই অভিযানে প্রায় ৩২,৬০০টি বেজি ধরা হয়।

২০১৮ সালের এপ্রিলে শেষবারের মতো একটি বেজি ধরা পড়ার পর টানা ৬ বছর পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। এরপর কোনো বেজির অস্তিত্ব না পাওয়ায় ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাপান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আমামি ওশিমা দ্বীপকে সম্পূর্ণ বেজিমুক্ত ঘোষণা করে। পরিবেশবিদ ও কর্মকর্তারা একে ‘অলৌকিক জয়’ বলে অভিহিত করেছেন। এটি বিশ্ব পরিবেশের ইতিহাসে বিষ ছড়ানো ছাড়া এত বড় ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে কোনো আক্রমণাত্মক শিকারি প্রাণী নির্মূলের প্রথম ঘটনা। তবে যে হাবু সাপের জন্য বেজি আনা হয়েছিল, সেই বিষাক্ত সাপ এখনো দ্বীপের জঙ্গলে রয়ে গেছে।

গবেষণা ও ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই বেজিগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯১০ সালে বাংলাদেশ থেকে। তখন বাংলাদেশ থেকে ছোট ভারতীয় বেজি প্রথম ওকিনাওয়া দ্বীপে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই ওকিনাওয়া থেকেই ১৯৭৯ সালে আমামি ওশিমায় ৩০টি বেজি স্থানান্তর করা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমামি দ্বীপের এই ঘটনা পুরো বিশ্বের পরিবেশবিদদের জন্য এক বড় শিক্ষা যে, বাস্তুতন্ত্র কোনো সাধারণ যন্ত্র নয় যে সুইচ টিপলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

শেয়ার করুন