অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে একটি নতুন, স্বাধীন ও স্থায়ী আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায়, গুমকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ নামের এই স্থায়ী আইনটি করা হচ্ছে। নতুন আইনের খসড়ায় পূর্ববর্তী অধ্যাদেশের কিছু বিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পাশাপাশি বেশ কিছু নতুন আইনি ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে প্রস্তাবিত এই আইনের খসড়া পর্যালোচনার লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, মিশন প্রধান ও উন্নয়ন সহযোগীদের উপস্থিতিতে খসড়া আইনের ওপর তাদের মতামত ও পর্যবেক্ষণ নেওয়া হবে। এর আগে গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে একটি নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পূর্ববর্তী অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন আইনের খসড়ায় তদন্তকারী সংস্থা, সাজার মেয়াদ এবং বিচারিক পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নিয়ে আইনি মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের দুজন যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, খসড়ায় মূলত চারটি বিষয়কে গুমের সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে: বলপূর্বক গুম, গুমের কারণে মৃত্যু, গুমের আলামত নষ্ট করা এবং গোপন আটকখানা তৈরি ও পরিচালনা। এছাড়াও গুমের অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সায় দেওয়া, উসকানি দেওয়া কিংবা সহযোগিতা করার বিষয়টিকেও অপরাধের আওতাভুক্ত করা হয়েছে।
খসড়া আইনের প্রস্তাব অনুযায়ী, গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। তবে কারাদণ্ডের বিধানে বড় ধরনের কঠোরতা আনা হয়েছে; পূর্ববর্তী অধ্যাদেশে সাজার মেয়াদ ‘অনধিক ১০ বছর’ (সর্বোচ্চ ১০ বছর) থাকলেও, নতুন খসড়ায় গুমের সর্বনিম্ন সাজা ‘১০ বছর কারাদণ্ড’ নির্ধারণের প্রস্তাব যুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। গুমের ঘটনার তদন্ত বাধ্যতামূলকভাবে ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে, বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত আরও ৩০ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। নির্দিষ্ট সময়ে তদন্তে ব্যর্থ হলে আদালতকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। মামলার বিচারকাজ ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিচার শেষ না হলে তিন দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টকে লিখিতভাবে কারণ অবহিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
পূর্ববর্তী অধ্যাদেশে গুমের ঘটনা তদন্তের প্রাথমিক দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও, ২০২৬ সালের নতুন খসড়ায় কমিশনকে এই প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী তদন্তের দায়িত্বকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সরকারি কোনো সংস্থার সদস্যদের মাধ্যমে বিস্তৃত, পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে কাউকে তুলে নেওয়ার বা গুম করার ঘটনাকে ‘পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিক গুম’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর তদন্তকারী সংস্থা ও বিচারিক আদালত হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। অন্যদিকে, সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততাহীন বা বিচ্ছিন্ন কোনো গুমের ঘটনাকে ‘সাধারণ গুম’ বলা হয়েছে, যা সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর তদন্ত করবে পুলিশ এবং বিচারিক আদালত হবে সাধারণ বিচারিক আদালত (জেলা ও দায়রা জজ আদালত)।
খসড়া আইনে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের আইনি অধিকার সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি টানা পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকলে তার পরিবার আদালত থেকে একটি ‘গুম সনদ’ নিতে পারবে। পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকা কোনো ব্যক্তির স্বজনরা মামলা করার পর তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে গৃহীত হলেই এই সনদ দেওয়া হবে। এই সনদের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর অবর্তমানে তার উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তি হস্তান্তর, বেচাকেনা, ব্যাংকিং লেনদেন ও বণ্টন-সংক্রান্ত নথিপত্রে আইনি অধিকার ও সহায়তা পাবেন। আইসিটি যেসব মামলার তদন্ত করবে, সেসব ক্ষেত্রে বাদিপক্ষ যেন ট্রাইব্যুনাল থেকেই সরাসরি স্বজনের গুম সনদ পেতে পারেন, খসড়ায় সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পুলিশ যেসব সাধারণ মামলার তদন্ত করবে, সেই পরিবারগুলোকে গুম সনদ দেবে সাধারণ বিচারিক আদালত।
প্রস্তাবিত খসড়াটির বেশ কিছু ধারা এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে দেশের শীর্ষ আইনি বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার গবেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো: তাজুল ইসলাম খসড়াটির দুটি প্রধান ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়বদ্ধতা) ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণের মাপকাঠি যেভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বলবৎ থাকলে বাহিনীর প্রধান বা কমান্ডারদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা কখনোই সম্ভব হবে না, যা এক ধরনের পরোক্ষ দায়মুক্তির রাস্তা তৈরি করবে। দ্বিতীয়ত, তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের হাতে দেওয়ায় নিরপেক্ষ ফল আসার কোনো কারণ নেই, কারণ যে বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বাহিনীই যদি নিজেদের তদন্ত করে, তাতে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ থাকবে। তিনি একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, ফরেনসিক ও ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পন্ন স্বতন্ত্র সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করেছেন, যার সদস্যরা পুলিশের হলেও দায়বদ্ধ থাকবেন মানবাধিকার কমিশনের কাছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য মো: সাজ্জাদ হোসেনও একই ধরনের গভীর আইনি ও কাঠামোগত ত্রুটি বিশ্লেষণ করেছেন। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ উদ্ধৃত করে তিনি জানান, প্রস্তাবিত ২০২৬ সালের বিলটি তার পূর্বসূরি ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের চেয়ে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, খসড়ার প্রস্তাবনা থেকে মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি পুনঃনিশ্চিতকরণ এবং গুমের বিরুদ্ধে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদের উদ্ধৃতি সচেতনভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী। তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে তদন্ত, অভিযোগ গ্রহণ ও মামলা পরিচালনার প্রতিটি ধাপের নিয়ন্ত্রণ অভিযুক্ত বাহিনীর (পুলিশ) ওপর ন্যস্ত করায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে। এছাড়াও প্রারম্ভিক অনুসন্ধান সংস্থা না থাকায়, যেকোনো প্রভাবশালী অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রথম শুনানিতেই মামলাটি ‘পদ্ধতিগত গুম’ দাবি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত বলে যুক্তি দিতে পারেন; যার ফলে এখতিয়ার নির্ধারণের আইনি জটিলতায় মূল বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন এই খসড়ার বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আইনের নতুন খসড়ায় যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার পাওয়ার বিষয়টিকে বেঁধে দেওয়া হয়, তবে তা একটি অগ্রগতি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গুমের ঘটনার তদন্তের ক্ষমতা দিলে তাতে ভালো ফল আসবে বলে মনে হয় না। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তাদের দিয়ে তদন্ত করালে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ থাকবে। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে গুমের বিষয়টিকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিল, সেটিকে বজায় রাখা উচিত।
উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার একটি গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অঙ্গসংগঠনের অন্তত এক হাজারেরও বেশি নেতাকর্মী ও সাধারণ নাগরিক গুমের শিকার হন, যাদের এক বিশাল অংশ আর কখনোই ফিরে আসেননি। এই পটভূমিতে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবির মুখে সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এই অধ্যাদেশটি অনুমোদনের জন্য বিল আকারে উত্থাপন না করায় তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারায়। যার ফলে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ পর্যালোচনায় অধ্যাদেশটিকে হুবহু আইন না করে, নতুন করে সংশোধিত আকারে এই ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর আগে, পর্যালোচনা বৈঠকে কেউ কেউ পৃথক আইন না করে প্রচলিত দণ্ডবিধি সংশোধন করেই গুমের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করার পক্ষে মত দেন। আবার অন্য একটি পক্ষ ‘হেফাজতে নিবারণ আইন’সহ সমপ্রকৃতির কিছু প্রচলিত আইনকে একত্রত করে একটি গুচ্ছভিত্তিক অপরাধ আইন তৈরির প্রস্তাব করেন। তবে সার্বিক মতামতের ভিত্তিতে বৈঠকে গুমকে একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আলাদা আইন করার বিষয়টিই চূড়ান্ত অগ্রাধিকার পায়।
বিকল্প প্রস্তাব ১ (দণ্ড-বিধি সংশোধন): একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে কেউ কেউ পৃথক আইন না করে প্রচলিত দণ্ডবিধি সংশোধন করেই গুমের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করার পক্ষে মত দেন। তাদের যুক্তি ছিল, ‘বলপূর্বক গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কনভেনশন’-এ স্বাক্ষরকারী অনেক দেশই তাদের প্রচলিত ফৌজদারি আইন সংশোধন
বিকল্প প্রস্তাব ২ (গুচ্ছভিত্তিক অপরাধ আইন): অন্য একটি পক্ষ ‘হেফাজতে নিবারণ আইন’সহ সমপ্রকৃতির কিছু প্রচলিত আইনকে একত্রত করে একটি গুচ্ছভিত্তিক অপরাধ আইন তৈরির প্রস্তাব করেন। তাদের যুক্তি ছিল, যেসব অপরাধে সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বা সরকারি বাহিনীর সদস্যদের অভিযুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে (যেমন, হেফাজতে মৃত্যু বা বলপূর্বক তুলে নেয়া);





