পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মসজিদে আজানের জন্য ব্যবহৃত লাউডস্পিকার অপসারণকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন মুসলিম নেতা ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, স্থানীয় থানার পুলিশ মৌখিকভাবে লাউডস্পিকার খুলে ফেলার জন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে।
রাজ্যের বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই আদালতের নির্দেশনা মেনে সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শব্দদূষণ সংক্রান্ত বিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই বিধি অনুযায়ী, দিনের বেলায় শব্দের সর্বোচ্চ সীমা ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নির্দেশনার আলোকে রাজ্য পুলিশকে নির্ধারিত ডেসিবেল সীমা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জানিয়েছেন, প্রশাসন কেবল আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করছে। তিনি দাবি করেন, এ পর্যন্ত মসজিদ ও মন্দির মিলিয়ে মোট ৫ হাজার ২৯৯টি লাউডস্পিকার অপসারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪ হাজার ২০৩টি মসজিদ থেকে এবং ১ হাজার ৯৬টি মন্দির থেকে সরানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, পুলিশকে বলপ্রয়োগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং মসজিদ কমিটিগুলো সহযোগিতা করেছে।
তবে এই ঘটনা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের একটি বিদ্রোহী অংশ শুক্রবার বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে উত্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার তৃণমূলের তিন বিদ্রোহী সাংসদ—সাবেক ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠান, খলিলুর রহমান ও আবু তাহের খান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একটি স্মারকলিপি জমা দেন। স্মারকলিপিতে তারা ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শব্দদূষণ সংক্রান্ত বিধিমালা এমনভাবে কার্যকর করার আহ্বান জানান যেন তাতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না লাগে।
তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক আখরুজ্জামান বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সবার নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ এবং হিন্দুরা যেমন স্বাধীনভাবে মন্দিরে পূজা করতে পারেন, মুসলমানরাও তেমনি মসজিদে আজান ও নামাজ আদায় করতে পারবেন। সাবেক মন্ত্রী ও তৃণমূল নেতা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী এ বিষয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ সদস্যরা মসজিদে গিয়ে পরিচালনা কমিটিগুলোর ওপর লাউডস্পিকার অপসারণের চাপ সৃষ্টি করছেন।
ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি রাজ্যের পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছেন, এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি নির্দেশ জারি করা হয়েছে কি না। তিনি নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নোটিশ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বিরোধীদের সমালোচনা করে বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে সবাই প্রতিবাদের অধিকার রাখে, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিমুখী নীতি পরিহার করা উচিত। তিনি বলেন, এটি বাবরের শাসন বা তুঘলকি প্রশাসন নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক দেশ। তার মতে, শুধু নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া বা অন্য কারো মত গ্রহণ না করার রাজনীতি রাজ্যের মানুষ মেনে নেবে না।





