ত্রয়োদশ সংসদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার

প্রকাশ:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ওপর বর্তমানে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এই দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারলে ইতিহাসে এই সংসদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একই সাথে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাষ্ট্রপতির পদের ক্ষমতার বিন্যাস ও দায়-দায়িত্ব নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি হয়ে পড়েছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির শূন্য পদ পূরণের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। এই রাষ্ট্র তথা বাংলাদেশ জাতি-উপজাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার প্রথম ও শেষ ঠিকানা, আর সবাই এর মুখে হাসি দেখতে চায়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হচ্ছে। এর মধ্যেই সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে বঙ্গভবনের মর্মর দেয়াল ভেদ করে তার পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ করেন। নির্বাচন কমিশনও ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। তবে এই নির্বাচন কেবল একজন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি—এই চার প্রধান পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য ও আলোচনার সুযোগ রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করলেও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ইয়াজউদ্দিন আহমদের কর্মকাণ্ড দল ও দেশনেত্রীকে সংকটে ফেলেছিল, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সংসদকে নতুন রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দিতে হবে।

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মূলত আলঙ্কারিক প্রধান এবং নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। তবে জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রস্তাবে ক্ষমতার একচ্ছত্র প্রয়োগ রোধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ভারসাম্য বিধানের দাবি উঠেছে। বিএনপির ৩১ দফা ও জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন প্রস্তাবনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো বা নির্বাচনপদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ, সংসদ আহ্বান ও ভেঙে দেওয়া এবং সাংবিধানিক পদে নিয়োগ প্রদান। তবে এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ভূমিকা সীমিত। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকাঠামো কেমন হবে তা নির্ভর করবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, সংসদের সিদ্ধান্ত এবং বিস্তৃত রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর। সবশেষে, জাতি ও রাষ্ট্রকে সংকট থেকে মুক্ত করে এগিয়ে নিতে হলে এই সংসদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার করুন