আফগানিস্তানের মতো একই ভুল ট্রাম্প করছেন ইরানে

প্রকাশ:

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চলেছে চলতি মাসে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মার্কিন বাহিনীর প্রস্থান বিশ্বজুড়ে এক বড় বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর ন্যাটো-সমর্থিত সেই আগ্রাসন এখন একটি ব্যর্থ অভিযান হিসেবেই বিবেচিত হয়। ওই যুদ্ধে ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মার্কিন ও ৪৫০ জন ব্রিটিশ সেনা প্রাণ হারান। এছাড়া প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য বেসামরিক মানুষ। আল-কায়েদাকে দমনের লক্ষ্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত তালেবান আবারও ক্ষমতায় ফিরে দমনমূলক শাসন কায়েম করেছে। পশ্চিমের এই হস্তক্ষেপকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের আদলে ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ (ফরএভার ওয়ার) হিসেবে দেখা হয়।

আফগানিস্তানের সেই বিপর্যয় থেকে রাজনীতিবিদ ও জেনারেলদের শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল, যাতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও বেরিয়ে আসার কৌশল ছাড়া কোনো সংঘাতে না জড়ানো হয়। তবে সেই শিক্ষা ইরাকের ক্ষেত্রেও কাজে লাগেনি। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সেখানে আগ্রাসন চালিয়েছিল এবং ২০১১ সালে তারা বিদায় নিয়েছিল। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান ইস্যুতে নেওয়া অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে, সেই একই বিপর্যয়কর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ট্রাম্প যে যুদ্ধকে ‘ছোটখাটো অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, তা ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের অধ্যাপক কার্টার মালকাসিয়ান, যিনি আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর উপদেষ্টা ছিলেন, মনে করেন আফগানিস্তানে ২০ বছর সেনা রাখার মূল যুক্তিটিই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়নি। অথচ এই যুদ্ধের পেছনে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে এবং ৭ লাখ ৭৫ হাজার সেনাকে মোতায়েন করা হয়েছিল। মালকাসিয়ানের মতে, এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাওয়া।

ইরাক যুদ্ধের ক্ষেত্রেও একইভাবে মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আগ্রাসন চালানো হয়েছিল। ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ দাবি করেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের সরকারের কাছে রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে এবং তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও পাকিস্তানে নাইন-ইলেভেন–পরবর্তী সহিংসতায় প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

বিশ্লেষক সাইমন টিসডাল মনে করেন, মার্কিন রাজনীতিবিদদের এই যুদ্ধে জড়ানোর পেছনে মূল কারণ হলো ‘ভীতি’। ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জেনেশুনেই ইরান-সংক্রান্ত হুমকি অতিরঞ্জিত করে দেখাচ্ছেন। ২০০৩ সালের ইরাকের মতোই ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। এর বাইরে ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা বা কিউবার মতো দেশগুলোর প্রতি বৈরী আচরণের পেছনে রয়েছে পশ্চিম গোলার্ধের ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর মানসিকতা। গণতন্ত্র প্রসারের নাম নিলেও ট্রাম্প এখন অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে মনোযোগ দিয়েছেন, যা হরমুজ প্রণালির মতো জায়গায় তাঁর সক্রিয়তা থেকেই স্পষ্ট।

শেয়ার করুন