আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিচার মানে শুধু শেখ হাসিনা বা কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিচার নয়। এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে সেই পুরো কাঠামো উন্মোচন করা, যার মাধ্যমে দল, সরকার, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার অংশবিশেষকে একসাথে ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রকৃত বিজয় তখনই অর্জিত হবে, যখন সাবেক শাসকরাও এমন একটি স্বাধীন আদালতে বিচার পাবেন, যে আদালত তাদের শাসনামলে তাদের বিরোধীরা পাননি। এটাই প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের মধ্যে মূল পার্থক্য এবং একটি দলীয় রাষ্ট্রের জায়গায় আরেকটি দলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ও একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র পুনর্গঠনের মধ্যকার পার্থক্যও এখানেই।
ফ্যাসিবাদ সবসময় সংবিধান ছিঁড়ে বা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে না। অনেক সময় নির্বাচন, সংসদ, আদালত ও পুলিশকে অক্ষত রেখেই রাষ্ট্রের ভেতরে প্রবেশ করে এবং আইনকে ক্ষমতাসীন দলের অস্ত্রে পরিণত করে। নাৎসি জার্মানি বা ফ্যাসিস্ট ইতালিতেও এভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকভাবে অধীনস্থ করে দল ও রাষ্ট্রকে একীভূত করা হয়েছিল। গত দেড় দশকের বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বুঝতে এই কাঠামোগত দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আদালতে ‘ফ্যাসিবাদ’ কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ অপরাধের নাম নয়; আদালত মতাদর্শের বিচার করে না, বরং হত্যা, গুম, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, মানবতাবিরোধী অপরাধ, নির্বাচনী সহিংসতা, প্রমাণ ধ্বংস, দুর্নীতি এবং অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতার মতো সুনির্দিষ্ট অপরাধের বিচার করে।
বিচার করতে হলে কেবল মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের দিকে তাকালে চলবে না, বরং আদেশের পুরো শৃঙ্খলকে তদন্তের আওতায় আনতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কোথা থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, কারা প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিলেন, কোন রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, পুলিশ-প্রধান, গোয়েন্দা কর্মকর্তা কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তা কী জানতেন, কে কোন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, কোন নির্দেশ লিখিত বা মৌখিক ছিল, এবং আহত ও নিহতের তথ্য গোপন বা ডিজিটাল তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে খুঁজতে হবে। এখানে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ফৌজদারি বিচারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; রাজনৈতিকভাবে শাসনব্যবস্থাকে দমনমূলক বলা গেলেও আদালতে আসামির সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণ করতে হয়।
ন্যুরেমবার্গের বিচারের মূল শিক্ষা হলো, অপরাধের দায় ব্যক্তিগত। নাৎসি শাসনের ভয়াবহতা সত্ত্বেও সব নাগরিক বা পার্টির সব সদস্যকে একই মাত্রায় দায়ী করা হয়নি; বরং নেতৃত্ব, পরিকল্পনা, জ্ঞান, অংশগ্রহণ এবং অপরাধে বাস্তব অবদানের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রসিকিউশনকে আসামির বাস্তব কর্তৃত্ব ও ভূমিকা প্রমাণ করতে হবে। কেবল পদে থাকার কারণে কাউকে দোষী করা যাবে না, বরং প্রসিকিউশনকে দেখাতে হবে যে আসামির আদেশ দেয়ার ক্ষমতা ছিল কি না এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি অপরাধ প্রতিরোধ বা অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেননি কেন। এটিই ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়ের মূল কথা।
আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে, বিচার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সরকার পরিবর্তন বা সাক্ষী হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও রাষ্ট্রের স্মৃতি হিসেবে নথি, হাসপাতালের রেকর্ড, ডিজিটাল যোগাযোগ, ভিডিও, ছবি ও গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংরক্ষণ জরুরি। দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের মতো বাংলাদেশেও একটি স্বাধীন ট্রুথ, দলিল সংরক্ষণ ও ক্ষতিপূরণ কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিস্তার ও নির্যাতনের ইতিহাস অনুসন্ধান করবে। তবে সেই কমিশনের কাজ হবে সত্য উদঘাটন, আর অপরাধী সাব্যস্ত করার ক্ষমতা কেবল স্বাধীন আদালতেরই থাকবে।
যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের প্রমাণ আছে কিন্তু ফৌজদারি দণ্ড দেয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই, তাদের ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন যাচাই বা ভেটিং প্রক্রিয়া চালু করা প্রয়োজন। অন্যথায়, পুরনো দলীয় প্রশাসন সরিয়ে নতুন আরেকটি দলীয় প্রশাসন বসানো হবে, যা ফ্যাসিবাদের কাঠামো ভাঙবে না। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দায়ও তদন্ত করা যেতে পারে, যদি প্রমাণিত হয় যে দলটি পরিকল্পিত সহিংসতায় লিপ্ত ছিল। তবে সব সমর্থককে অপরাধী ঘোষণা করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। পরিশেষে, ন্যায়বিচারের নামে নতুন কোনো অবিচার বা অস্পষ্ট আইন তৈরি করা যাবে না। ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটাতে হলে কেবল শীর্ষ নেতাদের শাস্তি নয়, বরং পুলিশ কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নজরদারিসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কার প্রয়োজন।





