২২ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৪৮ হাজার কমিটি, বাস্তবে খোঁজ নেই অধিকাংশের

প্রকাশ:

মশা নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সারা দেশে ৪৮ হাজার ৫৫৯টি কমিটি কাগজে-কলমে থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সেগুলোর কার্যকর উপস্থিতি নেই। স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০১৯ সালের ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ জাতীয় নির্দেশিকা’ অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত এই বিশাল কাঠামো তৈরির কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ কমিটি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও কোথাও কমিটি গঠনের কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি। দেখা যাচ্ছে ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কমিটির সংখ্যা ৪৮ হাজার ৫৫৯।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বর্তমানে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মঙ্গলবার পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৯৯৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৯০ হাজার ৩৫৬। মঙ্গলবার সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৫ হাজার ৭৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রাণহানির সংখ্যাও উদ্বেগজনক; মঙ্গলবার আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার আগের দিন মৃত্যু হয়েছিল ৯ জনের। সব মিলিয়ে এ বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮১ জনে। প্রতিদিন মৃত্যুর খবর দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল মঙ্গলবার আরও ১০ জন মারা গেছে। বরিশাল বিভাগে তিন মাসে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে ছয় গুণ। ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯০২ জন।

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে মূল দায়িত্ব পালন করার কথা স্থানীয় সরকার বিভাগের। কিন্তু বছরের পর বছর দায়িত্ব পালনে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলামের দাবি, জাতীয় পর্যায়, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৩৩০টি পৌরসভার কমিটিগুলো কাজ করছে। তবে মাঠ পর্যায়ের অন্যান্য কমিটির সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। অথচ ২০১৯ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতিটি পর্যায়ে কমিটি গঠন ও নিয়মিত সভা করার কথা বলা ছিল।

কাঠামো অনুযায়ী, সবচেয়ে নিচের স্তরে প্রতিটি ইউনিয়নে ওয়ার্ড পর্যায়ে ১১ সদস্যের কমিটি থাকার কথা, যার সভাপতি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার। দেশে ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়নে এ ধরনের ৪১ হাজারেরও বেশি ওয়ার্ড কমিটি থাকার কথা। এরপর পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে দুই ধরনের কমিটি এবং জেলা পর্যায়ে ৬৪টি কমিটি থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ২৪ সদস্যের একটি জাতীয় কমিটিও রয়েছে, যেখানে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত আছেন। জাতীয় কমিটির বছরে কমপক্ষে চারটি সভা করার নিয়ম থাকলেও তা কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সালের মতো বিশেষজ্ঞরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। প্রতিটি স্তরে কত সদস্যের কমিটি কবে, কাদের নিয়ে কমিটি গঠিত হবে, কমিটির কার্যপরিধি—এসব বিস্তারিত ওই নির্দেশিকায় লেখা আছে। সেই হিসাবে ওয়ার্ড ৪১ হাজার ৩৯১টি (প্রতি ইউনিয়নে ৯টি ওয়ার্ড হিসাবে)। সদস্যদের মধ্যে আছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধি, ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আরও ৫ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি।

বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, স্থানীয় পর্যায়ে কমিটির অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে। পাবনার বেড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক রুনাল্ট চাকমা জানান, কমিটি গঠনের কোনো নির্দেশনা তারা পাননি, ফলে কোনো কমিটিও নেই। নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল আমিনের ভাষ্যমতে, সেখানে মশা নিধন কার্যক্রম চললেও ওয়ার্ড পর্যায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো কমিটি নেই। আবার ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে টাস্কফোর্স থাকলেও ওয়ার্ড পর্যায়ে আগের কমিটিগুলো কার্যকর নেই বলে জানা গেছে।

একই চিত্র দেখা যায় যশোরের কেশবপুর ও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের মতো এলাকাগুলোতে। কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন, কোনো আনুষ্ঠানিক কমিটির সভা হয়নি, কেবল বিক্ষিপ্তভাবে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সন্দ্বীপে উপজেলা, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো কমিটিরই অস্তিত্ব নেই। তবে কিছু জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে কুমিল্লাসহ নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সচেতনতামূলক তৎপরতা শুরু হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, এই বিপুল সংখ্যক কমিটির কথা অনেকেরই জানা নেই। তিনি মনে করেন, মাঠ পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি কমিটিকে সচল করা এখন সময়ের দাবি। সব স্তরের কমিটি যদি সক্রিয়ভাবে কাজ করত, তবে সাধারণ মানুষকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা সহজ হতো। কিন্তু বর্তমানে বড় বড় নীতিনির্ধারণী সভাতেও মাঠ পর্যায়ের এই কমিটিগুলোর অস্তিত্ব নিয়ে অস্পষ্টতা থেকে যাচ্ছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনায় জেলা, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু লার্ভার উৎসস্থল ধ্বংস করা এবং নিয়মিত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা ছিল। জাতীয় কমিটির দায়িত্ব ছিল কার্যক্রমের সমন্বয়, তদারকি ও কর্মকৌশল হালনাগাদ করা। অথচ বাস্তবতা হলো, ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকা বা বড় শহরের সমস্যা নয়, বরং গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে আরও আন্তরিক ও উদ্যোগী না হলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

শেয়ার করুন