দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জ্বালানি খাতের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কুতুবজোমে এফএসআরইউ নির্মাণের জন্য চীনের চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিএনইই) প্রস্তাব সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে প্রক্রিয়াকরণ করা হবে। প্রকল্পটি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর ৬৮ ধারা এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫-এর ৯২(২) ও ১০৭(২) বিধি অনুযায়ী বাস্তবায়িত হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, জি-টু-জি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে সময় সাশ্রয় হয় এবং প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া সহজ হয়।
বর্তমানে দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে দেশীয় উৎপাদন চাহিদার অর্ধেক। মহেশখালীতে বিদ্যমান দু’টি টার্মিনাল প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে। নতুন টার্মিনালটি চালু হলে শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছে সরকার। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, আমদানিনির্ভরতা বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় এবং ভর্তুকির ঝুঁকিও বাড়বে। তাদের মতে, আমদানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং গভীর সমুদ্রের অফশোর ব্লক ও অনাবিষ্কৃত অনশোর ক্ষেত্রে কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
জ্বালানি কাঠামোর তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, স্থানীয় অনশোর গ্যাস (১-৩ ডলার/এমএমবিটিইউ) এলএনজি আমদানির তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী। নতুন অনশোর/জটিল ক্ষেত্র ৩-৫ ডলার/এমএমবিটিইউ এবং গভীর সমুদ্রের নতুন গ্যাস ৫-৭ ডলার/এমএমবিটিইউ। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এলএনজি আমদানিতে ৯.৫-১৩.৫ ডলার খরচ হলেও স্পট এলএনজি (২০২৬ সালের সঙ্কটকাল) ২০-২৮ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
একই বৈঠকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রস্তুত ও জমা দেওয়ার সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন নির্ধারণের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পুরনো দেশীয় গ্যাসের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এলএনজি প্রায় চার-আট গুণ বেশি ব্যয়বহুল। স্পট মার্কেট থেকে কেনা এলএনজি কখনো কখনো ১০-২০ গুণ পর্যন্ত বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি এবং নতুন টার্মিনাল নির্মাণ স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নমনীয় ও নির্ভরযোগ্য করবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানি, দেশীয় অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর তারা জোর দিয়েছেন।





