মাওলানা রুমি মানবতাবোধের উদ্বোধন প্রত্যাশা করে বলেছিলেন, সুন্দর ও উত্তম দিন তোমার কাছে আসবে না; বরং তোমারই এমন দিনের দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত। আত্মিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে মানুষকে মনুষ্যত্ব বিকাশের সাধনায় নিবেদিত হতে হবে। তার আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে রুমির সেই উক্তি, তোমার জন্ম হয়েছে পাখা নিয়ে, ওড়ার ক্ষমতা তোমার আছে। তারপরও খোঁড়া হয়ে আছো কেন। তোমার হৃদয়ে যদি আলো থাকে, তাহলে ঘরে ফেরার পথ তুমি অবশ্যই খুঁজে পাবে। এছাড়া গতকাল আমি বুদ্ধিমান ছিলাম, তাই পৃথিবীকে বদলে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আজ আমি জ্ঞানী, তাই নিজেকে বদলে ফেলতে চাই—এই দর্শন আত্মবিকাশের মূলমন্ত্র।
বর্তমান সময়ে জড়বাদের জয়জয়কার সর্বত্র। প্রযুক্তি ও মুক্ত অর্থনীতির প্রভাবে পুঁজিবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্বার্থপরতা এবং জাগতিক ভোগবিলাসই মানুষের চরম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধ্যাত্মিকতার আনন্দ এবং খোদাপ্রেমে অর্জিত মনের ঐশ্বর্য আজ অনেক ক্ষেত্রে অপাঙ্ক্তেয়। অথচ পরমাত্মার জ্ঞানলাভ এবং তাঁর প্রেমে আত্মসমর্পণই মানবজীবনের সার্থকতা। পরমাত্মা জ্ঞানের তিনটি মার্গ হলো জ্ঞানমার্গ, কর্মমার্গ এবং প্রেমমার্গ। প্রেমিক মানুষ নিজের আমিত্ব বিসর্জন দিয়ে প্রেমময়ের সন্তুষ্টি সাধনে ব্রতী হয়, যা তার প্রেমের পরিধিকে সমগ্র মানবজাতি ও সৃষ্টির মাঝে বিস্তৃত করে।
মানুষ দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে গঠিত। দেহ মাটির তৈরি অস্থায়ী কাঠামো, আর আত্মা স্বর্গীয় ও স্থায়ী। দেহ পিঞ্জিরার ভেতর আত্মা যেন অচিন পাখি। দৈহিক কামনা-বাসনা ও প্রবৃত্তির দাসত্বের কারণে আত্মার ওপর মরিচা পড়ে, ফলে স্বর্গীয় রূহের প্রতিফলন বাধাগ্রস্ত হয়। এই মরিচা পরিষ্কার করে পরমাত্মার সাথে সংযোগ স্থাপনই মরমি সাধকদের লক্ষ্য। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (১২০৭-১২৭৩) বলেছিলেন, আমি অনেক মানুষ দেখেছি যাদের শরীরে কোনো পোশাক নেই, আবার অনেক পোশাক দেখেছি যেগুলোর ভেতরে কোনো মানুষ নেই। এই পর্যবেক্ষণ আজকের সমাজের বুদ্ধিজীবী, রাষ্ট্রনায়ক ও সাধারণ মানুষের আত্মবিকাশের সংকটের প্রতি ইঙ্গিত দেয়।
রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের বাণী, নজরুলের আত্মিক সাধনা কিংবা কোলরিজের রাইম অব দ্য এনশিয়েন্ট মেরিনার—সবই আত্মসমালোচনার গুরুত্ব তুলে ধরে। ন্যায়-অন্যায় ও সুনীতি-দুর্নীতির ব্যবধান বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ। মাওলানা রুমির মতে, মোমবাতি হওয়া সহজ কাজ নয়, আলো দেয়ার জন্য নিজেকেই পুড়তে হয়। আত্মশক্তি অর্জনের জন্য কী বর্জন করতে হবে, তা জানাই প্রকৃত জ্ঞান। রুমি আরও বলেছেন, তুমি সাগরে এক বিন্দু পানি নও, তুমি এক বিন্দু পানিতে গোটা এক সাগর। আল্লামা ইকবালের আত্মিক প্রেরণা বা নিজের পথ তৈরির আহ্বানও একই সত্যের প্রতিধ্বনি। প্রকৃতির বিধান হলো, যে গাছ দম্ভভরে বড় হয়, ঝড় তাকে উপড়ে ফেলে। তাই সবার ভাগ্য উন্নয়নের সাথে নিজের স্বার্থের সমন্বয় ঘটিয়ে আত্মশক্তি বিকাশে মনোযোগী হওয়াই কাম্য।





