৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করছে টেকসই গণতান্ত্রিক সংস্কারের ওপর

প্রকাশ:

বাংলাদেশের ইতিহাসে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তবে এই আন্দোলনের প্রকৃত সার্থকতা ও সাফল্য নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কতটা গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, তার ওপর। মূলত জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রের নীতির মধ্যে দূরত্ব যখন মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়, তখনই পরিবর্তনের দাবি অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই সুযোগকে জাতীয় অর্জনে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার দায়িত্ব এখন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকের।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনা, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের এক সর্বজনীন দাবিতে রূপ নেয়। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, অনগ্রসর নৃগোষ্ঠী, নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোটা চালু করা হলেও সময়ের সাথে সাথে এর প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সম্প্রসারণ ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সমাজে অসন্তোষ তৈরি করে। ২০১৮ সালের আন্দোলনের পর কোটা বাতিলের সরকারি ঘোষণার পর ২০২৪ সালে বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেলে শিক্ষার্থীরা পুনরায় মাঠে নামে।

প্রাথমিকভাবে আন্দোলনটি একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি হলেও, আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন, সহিংসতা এবং ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মতোই চব্বিশের জুলাইয়েও রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়ে স্কুল, কলেজ, শহর ও জেলা পর্যায়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ সংহতি প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্ষেত্রে বিকল্প তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।

এই আন্দোলনের পর দেশের শাসনভার গ্রহণ করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকারের সামনে একদিকে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অন্যদিকে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করার দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনিক কাঠামো, বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের হারানো আস্থা পুনর্গঠন করাই এখন অন্যতম প্রধান কাজ। এই লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করলেও, ক্ষমতার প্রশ্ন সামনে আসার সাথে সাথে সংস্কারের গতিপথ জটিল আকার ধারণ করছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন কিছু নয়।

জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোকে জাতীয় এজেন্ডায় পরিণত করেছে। তবে পরিবর্তনের সুফল ধরে রাখতে হলে কেবল সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; বরং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও মানবাধিকারের মতো গণতান্ত্রিক ভিত্তিগুলো সুসংহত করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে কেবল futures নাগরিক নয়, বরং বর্তমানের রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে পুনর্মিলন ও প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে আগামী বাংলাদেশের প্রকৃত পথনির্দেশ। এই রূপান্তরের সফল সমাপ্তি এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞা ও জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার ওপর নির্ভর করছে।

শেয়ার করুন