মহাকাশে অপরাধ তদন্তে রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: নতুন দিগন্তের উন্মোচন

প্রকাশ:

ভবিষ্যতে মহাকাশে মানুষের উপস্থিতি ও বসবাস পুরোদমে শুরু হলে সেখানে সংঘটিত অপরাধ, বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত একটি জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তবে এই রহস্য উন্মোচনে রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উন্নত ডিজিটাল ইমেজিং প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বৃটেনের নর্থাম্ব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী ও ফৌজদারি আইনজীবী ড. মেহযেব চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে গবেষণা করছেন এবং তিনি বিশ্বাস করেন, এসব প্রযুক্তি ছাড়া তদন্তের ফলাফল পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। বিবিসি সায়েন্স প্রকাশিত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে ড. মেহযেব চৌধুরীসহ জ্যাক কোয়ালস্কে, ড. ক্রিস শেফার্ড ও ড. ভ্যালেরি রাইডারের মতো বিশেষজ্ঞরা মহাকাশে অপরাধ তদন্ত ও সমাধানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন।

ড. মেহযেব চৌধুরী ২০১৬ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় ‘ম্যাবম্যাট’ নামে একটি বিশেষ রোবট তৈরি করেন। এই রোবটটি অপরাধস্থলের ৩৬০ ডিগ্রি ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম, যা পরে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে ঘটনাস্থল পৃথিবীতে বসেই হুবহু পুনর্নির্মাণ করে তদন্তকারীদের বিশ্লেষণের সুযোগ দেয়। ড. চৌধুরী বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতে এমন রোবটে উচ্চ-রেজ্যুলুশনের ত্রিমাত্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার এবং খালি চোখে অদৃশ্য প্রমাণ শনাক্ত করতে সক্ষম হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং যুক্ত হতে পারে। তার মতে, ভবিষ্যতের অ্যাস্ট্রোফরেনসিক তদন্তে এই ধরনের রোবটই হবে তদন্তকারীদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহকারী।

মহাকাশে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে এবং ভবিষ্যতে বেসরকারি মহাকাশ ভ্রমণও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: মহাকাশে যদি কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটে, তাহলে তার তদন্ত হবে কীভাবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) মতো সীমাবদ্ধ পরিবেশে খুনের রহস্য অনেকটা ক্লাসিক গোয়েন্দা উপন্যাসের মতোই হতে পারে। সেখানে সবাই একই জায়গায় আটকে থাকে, সন্দেহভাজনের সংখ্যা সীমিত এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগও সম্ভব নয়। ১৯৮০ সালে সোভিয়েত নভোচারী ভ্যালেরি রিউমিন তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘মাত্র ৫ বাই ৬ মিটারের একটি কেবিনে দু’জন মানুষকে দুই মাস আটকে রাখলে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্তই পূরণ হয়ে যায়।’

পৃথিবীতে অপরাধ তদন্তে ব্যবহৃত ফরেনসিক কৌশলগুলো মহাকাশে একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা অতি স্বল্প মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে রক্ত, তরল বা অন্যান্য প্রমাণের আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা এখন ‘অ্যাস্ট্রোফরেনসিকস’ নামে নতুন একটি গবেষণা ক্ষেত্র গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন, যার লক্ষ্য হলো মহাকাশে সংঘটিত সম্ভাব্য অপরাধ তদন্তের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি ও পদ্ধতি তৈরি করা।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার রোজওয়েল পুলিশ বিভাগের ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশন (সিএসআই) ইউনিটের ফরেনসিক গোয়েন্দা জ্যাক কোয়ালস্কে এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মূল প্রশ্ন ছিল, মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে রক্তের ছিটা কীভাবে পরিবর্তিত হয়? পৃথিবীতে রক্তের ফোঁটার গতিপথ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা আঘাতের দিক, অবস্থান এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি বুঝতে পারেন। কিন্তু মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব ভিন্ন হওয়ায় সেই বিশ্লেষণও বদলে যেতে পারে।

এই গবেষণার জন্য কোয়ালস্কে ইউনিভার্সিটি অব লুইসভিলের মহাকাশ চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. জর্জ প্যান্টালোসের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। তারা ‘ভমিট কমেট’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ গবেষণা বিমান ব্যবহার করেন, যা বারবার ওপরে উঠে এবং দ্রুত নিচে নেমে অল্প সময়ের জন্য মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশ সৃষ্টি করে। সেই সময় একটি সিরিঞ্জ দিয়ে কৃত্রিম রক্ত কাগজের ওপর ছিটিয়ে দেখা হয়, স্বল্প মাধ্যাকর্ষণে রক্তের ছিটা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে রক্তের একটি ফোঁটা সমতল পৃষ্ঠে পড়লে মাধ্যাকর্ষণের কারণে সেটি ছড়িয়ে পড়ে এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এর ধরন বিশ্লেষণ করে রক্তের উৎস ও আঘাতের কোণ নির্ধারণ করতে পারেন। কিন্তু মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে এই নিয়ম কাজ করে না। গবেষক ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ জ্যাক কোয়ালস্কে বলেন, মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে রক্তের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে পৃষ্ঠটান (সারফেস টেনশন)। ফলে রক্তের ফোঁটা পৃষ্ঠে ছড়িয়ে না পড়ে ছোট গোলাকার অবস্থায় থেকে যায়। এতে তদন্তকারীরা শুধু ছোট ছোট রক্তের দাগ দেখতে পান, কিন্তু সেগুলো কোথা থেকে এসেছে বা কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা নির্ভুলভাবে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। আইএসএস-এর মূল মডিউলে নাকি কুপোলা অংশে কেউ আহত হয়েছেন, দেয়ালে লেগে থাকা ক্ষুদ্র রক্তের দাগ সেই প্রশ্নের উত্তর নাও দিতে পারে।

এই পরীক্ষা সহজ ছিল না। কোয়ালস্কে জানান, মাইক্রোগ্র্যাভিটির পরপরই বিমানটি দ্বিগুণ মাধ্যাকর্ষণের (২জি) অবস্থায় প্রবেশ করে, ফলে তৈরি হওয়া রক্তের দাগ সঙ্গে সঙ্গেই পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং পরীক্ষার ফল আংশিকভাবে নষ্ট হয়। এছাড়া বিমানের ভেতরে জায়গা সীমিত থাকায় গবেষকরা কাগজ থেকে মাত্র ২০ সেন্টিমিটার দূরত্বে তৈরি হওয়া রক্তের দাগই পরীক্ষা করতে পেরেছিলেন।

পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণের কারণে গুলি ধীরে ধীরে নিচের দিকে বাঁক নেয়। কিন্তু মহাকাশে গুলি একবার ছোড়া হলে তা সোজা পথে চলতে থাকে যতক্ষণ না কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। কোয়ালস্কের ভাষায়, জড়তা রক্তের ফোঁটাকে একই সরল পথে চলতে বাধ্য করে। আইএসএস-এর দীর্ঘ ও সরু করিডোরের মতো মডিউলগুলোর ভেতরে এই বৈশিষ্ট্য রক্তের প্রকৃত উৎস খুঁজে বের করাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

খুনের অস্ত্র খুঁজে বের করাও মহাকাশে এক নতুন চ্যালেঞ্জ। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাকাশে গুলি চালানো হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পৃথিবীর মতোই থেকে যাবে। বন্দুকের ট্রিগার চাপার সঙ্গে সঙ্গে চেম্বারের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটে এবং তৈরি হয় গ্যাস ও রাসায়নিক কণার একটি মেঘ, যাকে গানশট রেসিড্যু বলা হয়। বৃটেনের ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের ফরেনসিক ব্যালিস্টিকস বিশেষজ্ঞ ড. ক্রিস শেফার্ড বলেন, এই কণাগুলো পরে ক্ষুদ্র তরল ফোঁটা ও কঠিন কণায় পরিণত হয়ে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বন্দুক, শুটার, ভুক্তভোগী এবং পুরো ঘটনাস্থলই এসব রাসায়নিক প্রমাণে ঢেকে যেতে পারে।

পৃথিবীতে গোসল করে অনেক প্রমাণ মুছে ফেলা গেলেও মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীরা সাধারণত স্পঞ্জ ও সাবান দিয়ে শরীর পরিষ্কার করেন। ফলে গুলির অবশিষ্ট রাসায়নিক কণা পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা অনেক বেশি কঠিন হতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে এসব কণা বাতাসে দীর্ঘ সময় ভেসে থাকতে পারে এবং স্টেশনের বায়ু চলাচল ব্যবস্থার মাধ্যমে ফিল্টারে আটকে যেতে পারে। তদন্তকারীরা সেই ফিল্টার পরীক্ষা করে কী ধরনের গুলি ব্যবহার করা হয়েছে, কোন ধরনের অস্ত্র থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে, এমনকি কখন গুলি ছোড়া হয়ে থাকতে পারে, তা জানতে পারবেন।

মহাকাশে অপরাধ তদন্ত শুধু রক্তের দাগেই সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীতে আহত ব্যক্তির রক্ত মেঝেতে জমে যায় বা অপরাধী হাঁটলে রক্তের ফোঁটার একটি ধারাবাহিক পথ তৈরি হয়। কিন্তু মহাকাশে রক্ত নিচে পড়ে জমবে না, আবার চলার সময়ও সেই পরিচিত রক্তের রেখা তৈরি হবে না। তাই ভবিষ্যতের মহাকাশ গোয়েন্দাদের শুধু প্রচলিত ফরেনসিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না।

এই গবেষণা মহাকাশভিত্তিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হলেও এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। গবেষকেরা জানতে চান, মহাকাশ স্টেশনের ভেতরে অক্সিজেন সরবরাহকারী বাতাসের প্রবাহ কি রক্তের ফোঁটার গতিপথ বদলে দিতে পারে? মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে রক্ত কীভাবে শুকায়? মহাকাশযানের বিশেষ জলবিমুখ (হাইড্রোফোবিক) পৃষ্ঠে রক্তের আচরণ কী রকম হয়? আগামী কয়েক দশকে মহাকাশে মানুষের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধ সংঘটনের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যাবে না। তাই এখন থেকেই মহাকাশভিত্তিক ফরেনসিক বিজ্ঞান ও তদন্ত পদ্ধতি উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, যাতে একদিন যদি সত্যিই শোনা যায় ‘হাউসটন, উই হ্যাভ এ হোমিসাইড!’— সেই রহস্য সমাধানের জন্য বিজ্ঞানী ও গোয়েন্দাদের প্রস্তুতি আজ থেকেই শুরু হয়ে গেছে।

শেয়ার করুন