বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম উত্তপ্ত ও সংকটময় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সেদিন দেশজুড়ে কারফিউ জারি করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। একই সঙ্গে ২১ ও ২২ জুলাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রথম দফায় ১৯ জুলাই রাত ১২টা থেকে ২০ জুলাই দুপুর ১২টা পর্যন্ত কারফিউ বহাল ছিল। এরপর দুই ঘণ্টার বিরতি দিয়ে পুনরায় কারফিউ শুরু হয়, যা ২১ জুলাই বিকেল পর্যন্ত কার্যকর রাখার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৩৭ জন নিহত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত তথ্য সংগ্রহে ব্যাপক বাধার সৃষ্টি হয়েছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ২০ জুলাই পর্যন্ত নিহতের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪৮ জনে। অন্যদিকে, বিএনপি দাবি করেছিল যে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। টানা তৃতীয় দিনের মতো ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে এবং রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যানবাহন চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কারফিউ চলাকালে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়ার জন্য ডিএমপির বিশেষ কারফিউ পাস ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
২০ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, উত্তরা, নিউমার্কেট, সায়েন্সল্যাব, বাড্ডা, রামপুরা, ভাটারা, ধানমন্ডি, আজিমপুর ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছুড়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। এ সময় মিরপুরের কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। জননিরাপত্তার স্বার্থে সরকার মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে এবং যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জে হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আটকে পড়া পুলিশ ও সাধারণ মানুষকে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সমন্বিত অভিযানে উদ্ধার করা হয়।
দেশজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সরকারি ভবন, কারাগার, মন্ত্রণালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসভবনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়। বিভিন্ন মোড়ে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের যৌথ চেকপোস্ট বসানো হয় এবং র্যাবের হেলিকপ্টার টহল অব্যাহত ছিল। রাজনৈতিক অঙ্গনেও অস্থিরতা ছিল তুঙ্গে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়, আর এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া নজরুল ইসলাম খান ও রুখুল কবির রিজভীকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। এছাড়া বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং পরে তাদের আদালতে হাজির করা হয়।
একই দিনে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বৈঠক হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা আট দফা দাবি উত্থাপন করেন। বৈঠক শেষে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আলোচনাকে ফলপ্রসূ দাবি করে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক ও সমাধানযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, বিএনপি-জামায়াত সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে, আন্দোলনের সমন্বয়করা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংস কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তারা এর দায় নেবেন না। কারফিউ, সেনা মোতায়েন ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে পার হওয়া ২০ জুলাইয়ের এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক আলোচিত অধ্যায়।





