২২ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের নিউরন প্রতিস্থাপন: গবেষণায় নতুন দিগন্ত

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এক যুগান্তকারী পরীক্ষায় জিনগতভাবে পরিবর্তিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে ল্যাবে তৈরি মানব কোষ প্রতিস্থাপন করেছেন। গবেষণার জন্য এমন ইঁদুর বেছে নেওয়া হয়, যাদের সেরেব্রাল কর্টেক্স অংশটি ছিল না। নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার মাধ্যমে সিজোফ্রেনিয়া, সেরিব্রাল পালসি ও ডিমেনশিয়ার মতো জটিল মস্তিষ্কের রোগের রহস্য উন্মোচনের পথ খুলতে পারে।

বিজ্ঞানীরা ইঁদুরগুলোর জন্মের সময় সেরেব্রাল কর্টেক্স ও সংলগ্ন হিপোক্যাম্পাস অংশ ছাড়াই বেড়ে ওঠার সুযোগ দেন। দুই দিন বয়সে ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কের শূন্যস্থানে মানব অর্গানয়েড বা ক্ষুদ্র কোষপুঞ্জ প্রবেশ করানো হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ইঁদুরের নিজস্ব নিউরন অপসারণ করে সেখানে ৪০ লাখ মানব নিউরন যুক্ত করা হয়। মোট ২৯টি ইঁদুরের ওপর চালানো এই পরীক্ষার মধ্যে ২৫টি সফল হয়েছে। তিন মাসের মাথায় মানব টিস্যুগুলো প্রায় পাঁচগুণ বড় হয়ে মস্তিষ্কের ফাঁকা অংশের ৯০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করে ফেলে।

গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন যে এটি কোনো মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন নয় এবং এই ইঁদুরগুলো মানুষের মতো চিন্তা করতে সক্ষম নয়। মস্তিষ্ক অর্ধেক মানব টিস্যু দিয়ে তৈরি হওয়া সত্ত্বেও ‘এলিয়েন-কর্টেক্স’ বিশিষ্ট এই ইঁদুরগুলো স্বাভাবিকভাবেই হাঁটাচলা ও শব্দ করতে পারে। গোলকধাঁধার পরীক্ষায় দেখা গেছে, মানব কোষ যুক্ত ইঁদুরগুলো সাধারণ ইঁদুরের তুলনায় অনেক ভালো পারফর্ম করেছে, যা তাদের অনুধাবন ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রমাণ। এছাড়া এগুলোর মস্তিষ্কে অপ্রত্যাশিতভাবে ‘ভন ইকোনোমো’ নিউরন পাওয়া গেছে, যা সাধারণত মানুষ ও বানরের মতো উচ্চতর প্রাণীর মস্তিস্কেই থাকে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সের্গিউ পাসকা জানান, সরাসরি জীবিত মানব মস্তিষ্কে পরীক্ষা চালানো কঠিন হওয়ায় এই মডেল গবেষকদের জন্য অভাবনীয় দিকনির্দেশনা দেবে। কম অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এই ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কের ক্ষতি ও হাঁটাচলায় সমস্যা দেখা দেয়, যা মানব শিশুদের ক্ষেত্রেও ঘটে থাকে। এটি সেরিব্রাল পালসির মতো রোগ নিয়ে গবেষণায় বড় ভূমিকা রাখবে।

গবেষণার এই অগ্রগতি নৈতিক প্রশ্নেরও জন্ম দিচ্ছে। ল্যাবে তৈরি মানব কোষ প্রাণীর শরীরে চেতনা বা অনুভূতি তৈরি করতে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় ইঁদুরের বয়স ছয় মাস হতেই পরীক্ষাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জন ইভান্সের মতে, বর্তমান পরীক্ষায় বড় কোনো নৈতিক সংকট না থাকলেও ভবিষ্যতে বড় প্রাণীর ওপর এমন পরীক্ষা বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তাই আপাতত ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর মধ্যেই এই গবেষণা সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

শেয়ার করুন