ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও এর অধীন বিজ্ঞান পাঠাগারে বই জমা দিতে সামান্য দেরি হলেই শিক্ষার্থীদের গুণতে হয় জরিমানা। তবে এই জরিমানার পরিমাণ মাত্র এক টাকা হলেও তা পরিশোধের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ও ভোগান্তির। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই সামান্য টাকা জমা দেওয়ার জন্যও তাদের ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়, যা বর্তমান ডিজিটাল যুগে একেবারেই অযৌক্তিক।
সম্প্রতি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলা হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। নাবিলা জানান, পূজার ছুটির কারণে নির্ধারিত সময়ে বই ফেরত দিতে না পারায় তাকে এই জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার কাছে থাকা জরিমানার ফরমে ৩ নভেম্বর গ্রন্থাগারের একজন কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে, যেখানে জরিমানার পরিমাণ লেখা হয়েছে মাত্র এক টাকা। লাইব্রেরির বই ফেরত দিতে আট-নয় দিন দেরির কারণে এমন পরিস্থিতিতে পড়েন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সায়েন্স লাইব্রেরি মূলত কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের আওতাধীন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে জরিমানার হার নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।
সেখানে একটি অংশে বিলম্বের প্রথম দুই সপ্তাহের জন্য ৫০ পয়সা, তৃতীয়-চতুর্থ সপ্তাহে এক টাকা এবং পরবর্তী সময় থেকে তিন টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রন্থাগারের অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতি বইয়ের জন্য প্রতি সপ্তাহ বা তার অংশের বিলম্বে ২৫ পয়সা জরিমানা এবং তা হিসাব দপ্তরে নগদে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। শিক্ষার্থীর দেওয়া পোস্টের সঙ্গে গ্রন্থাগারের জরিমানা আদায়ের একটি ফরমের ছবিও রয়েছে। তবে এই হার প্রতি সপ্তাহের জন্য, নাকি উল্লিখিত সময়ের জন্য মোট জরিমানা, তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে একই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গ্রন্থাগারের অধ্যাদেশভিত্তিক নীতিমালার ১৪ নম্বর বিধানে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি বইয়ে প্রতি সপ্তাহ বা সপ্তাহের অংশবিশেষের বিলম্বে ২৫ পয়সা জরিমানার কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের মে মাস থেকে বিভিন্ন ফি অনলাইনে জমা দেওয়ার উদ্যোগ নিলেও গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রে সেই আধুনিকায়ন এখনো পৌঁছায়নি। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোস্তাকিম বলেন, বর্তমান যুগে অনেক সেবা অনলাইনে পাওয়া সম্ভব হলেও জরিমানা দিতে ব্যাংকমুখী হওয়াটা চরম বিরক্তিকর। শিক্ষার্থীরা এই প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে জরিমানা পরিশোধের এই প্রক্রিয়াটি অনলাইন সেবার আওতায় নিয়ে আসতে পারে। ২০২৫ সালের ১৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলের জামানতসহ বিভিন্ন ফি অনলাইনে অথবা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দিতে।
এই পুরোনো পদ্ধতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক। তিনি স্বীকার করেছেন যে, এক টাকা জরিমানা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করার বিষয়টি অযৌক্তিক। এই নিয়মটি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে চলে আসছে বলে জানান তিনি। তবে ছোট অঙ্কের জরিমানা পরিশোধের জন্য বিকল্প কোনো উপায় বের করা যায় কি না, তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। কিন্তু জরিমানার অঙ্ক যখন মাত্র এক টাকা, তখন তা পরিশোধ করতে ব্যাংকে যাওয়া এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী মনে করেন, ব্যাংকের মাধ্যমে এই জরিমানা পরিশোধের প্রক্রিয়াটি শিক্ষার্থীদের জন্য একধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে।
তিনি বলেন, লেনদেনের স্বচ্ছতার খাতিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমেই জমা নেওয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীদের এই ভোগান্তি কমাতে দ্রুতই কিউআর কোড বা অনলাইনভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের।
উল্লেখ্য, বর্তমানে এক টাকার কাগুজে নোটের ব্যবহার অনেকটাই কমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের মে মাসে নতুন নকশার নোটের যে তালিকা প্রকাশ করেছিল, তাতে এক টাকার নোট অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তারপরও এই মুদ্রা বা ধাতব কয়েনের প্রয়োজনে ব্যাংক পর্যন্ত ছোটাছুটি শিক্ষার্থীদের সময় ও পরিশ্রম উভয়ই নষ্ট করছে বলে ভুক্তভোগীরা মনে করছেন। এক টাকার কাগুজে নোট এখন সাধারণ লেনদেনে খুব একটা দেখা যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ২৯ মে নতুন নকশার যেসব নোট ছাপানোর ঘোষণা দেয়, সেই তালিকায় এক টাকার নোট ছিল না।





