ঢাকায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে চিত্রনায়িকা পরীমনির দেহরক্ষীদের বিরুদ্ধে এক বিচারপ্রার্থীর মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার জামিন নিতে আসার সময় পরীমনির ১১ জন দেহরক্ষী আদালত চত্বরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। স্থানীয় এক বিচারপ্রার্থী মো. সুজন অভিযোগ করেন, তার বড় ভাইসহ তারা আদালতে পারিবারিক জমিসংক্রান্ত মামলার কাজে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় কোনো কারণ ছাড়াই পরীমনির দেহরক্ষীরা তাদের ধাক্কা দেয় এবং একপর্যায়ে সুজনের মাথায় আঘাত করলে সেখান থেকে রক্তপাত শুরু হয়। উপস্থিত লোকজন তাকে দ্রুত পাশের হাসপাতালে চিকিৎসার পরামর্শ দেন। এদিন পরীমনির সঙ্গে কালো পোশাক পরা ১১ জন দেহরক্ষী ছিলেন। আদালতের সামনে পরীমনির দেহরক্ষীর আঘাতে মাথা ফেটে যাওয়ার অভিযোগ করেন মো. সুজন নামের এক বিচারপ্রার্থী। তাঁর বড় ভাই জানান, পারিবারিক জমিসংক্রান্ত মামলায় তাঁরা আদালতে এসেছিলেন। এতে তাঁর মাথা থেকে রক্ত বের হতে থাকে। তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘কত বড় সাহস, গায়ের মধ্যে হাত দেয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, পরীমনির দেহরক্ষীরা শুধু বিচারপ্রার্থীকেই মারধর করেননি, বরং পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদেরও বাধা দিয়েছেন। এক পর্যায়ে কয়েকজন সংবাদকর্মীর কাছ থেকে জোরপূর্বক মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরে অবশ্য সাংবাদিকরা তাদের ফোন ফেরত পেয়েছেন। আদালত প্রাঙ্গণে এহেন অনাকাঙ্ক্ষিত ও হট্টগোলপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় উপস্থিত আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। পরীমনির আইনজীবী আদালতকে জানান, তাঁর মক্কেল আগের দিন অসুস্থ থাকায় হাজির হতে পারেননি।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে একটি সাদা গাড়িতে করে আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছান পরীমনি। দীর্ঘ সময় গাড়িতে অপেক্ষার পর বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তিনি নিচে নেমে আসেন। এরপর বিভিন্ন আদালতকক্ষের দরজায় গিয়ে শুনানি শুরু না হওয়ায় তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত একতলা নিচে সংশ্লিষ্ট আদালতে বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে হাজিরা দিয়ে পেছনের বেঞ্চে বসেন। পরে লিফটে উঠে প্রথমে ভুল আদালতকক্ষে ঢোকেন পরীমনি। তাঁর আইনজীবীর সহকারী সেখানে গিয়ে অন্য আদালতে শুনানি হওয়ার কথা জানালে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন। আদালতকক্ষে অতিরিক্ত ভিড় ও হট্টগোলের মধ্যে জামিন আবেদনের শুনানি হয়।
এদিকে নিজের দেহরক্ষীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও আদালত চত্বরের পরিস্থিতি নিয়ে পরীমনির আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি জানান, তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে কোনো মারধরের ঘটনা দেখেননি। তবে যদি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো অঘটন ঘটে থাকে, তবে সেটি অনাকাঙ্ক্ষিত বলে স্বীকার করেন। তিনি আরও বলেন, আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন ছিল। যথাযথ নিরাপত্তা থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে নীলাঞ্জনা রিফাত বলেন, ‘আমি এ ধরনের ঘটনা দেখিনি। আমি সেখানে ছিলাম না, তাই সরেজমিনে কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারছি না।’। নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নীলাঞ্জনা রিফাত বলেন, ‘পুলিশ যদি ঠিকমতো নিরাপত্তা দিত, তাহলে আপনাদের সঙ্গে এবং আমার আসামির সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা ঘটত না।
আদালত চত্বরে পরীমনি নিজেও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ তোলেন। গাড়িতে ওঠার আগমুহূর্তে এক ব্যক্তির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি দাবি করেন, কেউ একজন তার গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ সময় মুঠোফোন হাতে থাকা ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডা হয়। ওই ব্যক্তি ভিডিও ধারণ করছিলেন বলে পাল্টা দাবি করলে পরীমনি দ্রুত গাড়িযোগে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন।
উল্লেখ্য যে, ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন পরীমনি।
বিচারক মাহফুজুর রহমান ৫০০ টাকার মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন।
এর আগে বুধবার আদালতে হাজিরা না দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল।
মামলাটি ২০২২ সালের ৬ জুলাই দায়ের করেন নাসির উদ্দিন মাহমুদ। তার অভিযোগ, ২০২১ সালের জুন মাসে ঢাকা বোট ক্লাবে পরীমনি তাকে গ্লাস ও মুঠোফোন ছুড়ে মেরে ভয়ভীতি দেখিয়েছিলেন। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে এর আগেই নাসির ও অন্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার পাল্টা মামলা করেছিলেন পরীমনি। নাসিরের করা এই মামলায় গত বছরের ২৬ জানুয়ারি আদালত অভিযোগ গঠন করেছিলেন, যেখানে অনুপস্থিত থাকায় পরীমনির বিরুদ্ধে সেই সময়ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল।





