২০ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিত্যপণ্যের দামের চাপ: জীবনযাত্রার সংকটে দিশেহারা মানুষ

প্রকাশ:

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের বাজারদর নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল সরকারি মালিকানাধীন দৈনিক বাংলা। ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর সেই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘ঢাকায় মাছ, ডিম ও শাকসবজির দাম কমেছে’। তৎকালীন ঢাকা শহরসহ দেশের সর্বত্র স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে ইতিবাচক সুর ছিল সেই লেখায়। তবে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। এর মাত্র ২২ দিন পর ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি একই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, অতি মুনাফার লালসাই প্রধান কারণ’। সেই সময় থেকেই চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম—এই যুক্তি দেখিয়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা শুরু হয়। এসব দ্রব্যাদির মধ্যে রয়েছে শাক-সবজি, মাছ, ডিম, মাংস ইত্যাদি।’। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম—এই মোক্ষম যুক্তি দেখিয়ে তাঁরা অর্থনীতি শাস্ত্রের সূত্র ধরেই জিনিসের দাম বাড়িয়ে চলেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্যে এটা নেহায়েতই স্বাভাবিক। চাল, ডাল, সরিষার তেল, সাবান, শিশুখাদ্য, সিগারেট, দেশলাই, ব্লেড, ইত্যাদি হরেক রকমের জিনিসের মূল্যই বেড়েছে।

সেই থেকে গত ৫৫ বছর ধরে দেশে নিত্যপণ্যের দাম কেবলই বেড়েছে। শুধু যে নিত্য দিনের অতি আবশ্যকীয় কেরোসিনের দামই বেড়েছে তা নয়।

বাজেট বক্তৃতায় মূল্যস্ফীতি আর জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও এর স্থায়ী সমাধান অধরা রয়ে গেছে।

আয় বাড়লেও মূল্যস্ফীতির দাপট অনেক সময় সেই আয়কে ছাপিয়ে গেছে।

বিশ্বজুড়েও এমন সংকট নতুন নয়।

হাইপার-ইনফ্লেশন বা অতি মূল্যস্ফীতির নজির হিসেবে ১৯৪৬ সালে হাঙ্গেরির কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে প্রতি ১৫ ঘণ্টায় জিনিসের দাম দ্বিগুণ হতো। এছাড়া ১৯২৩ সালের জার্মানিতে মাসিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ শতাংশ, ২০০৮ সালের জিম্বাবুয়েতে তা ৭ হাজার ৯৬০ কোটি শতাংশে পৌঁছায়। যুগোস্লাভিয়ায় ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে মাসিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৩১ কোটি ৩০ লাখ শতাংশ, ভেনেজুয়েলায় ২০১৮ সালে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার শতাংশ এবং আর্জেন্টিনায় ১৯৮৯ সালের জুলাইয়ে এক মাসে দাম বেড়েছিল ১৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ। রিপোর্টটির শুরুটা ছিল এ রকম: ‘আজকাল জনজীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। কোন কোন জিনিসের দাম ইতিমধ্যেই আকাশচুম্বী হয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবার উপক্রম হয়েছে। তা না হলে বাজারে জিনিস আছে অথচ দাম আকাশচুম্বী হবে কেন। সেখানে সাফল্যের কথা কম, ব্যর্থতার কথাই বেশি। অতিমূল্যস্ফীতির উদাহরণও অনেক আছে, যাকে তত্ত্বগতভাবে বলা হয় হাইপার–ইনফ্লেশন। সাধারণভাবে, এক মাসে মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশ ছাড়ালে তাকে হাইপার–ইনফ্লেশন বলা হয়। বিশ্বে সবচেয়ে ভয়াবহ হাইপার–ইনফ্লেশনের ঘটেছিল হাঙ্গেরিতে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি কেবল দৈনন্দিন দুর্ভোগই বাড়ায় না, এটি রাজনৈতিক অস্থিরতারও কারণ হতে পারে। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড মূল্যস্ফীতিকে ‘এক নম্বর গণশত্রু’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। ২০১১ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যমূল্য বাড়লে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে অস্থিতিশীলতা বাড়ে। এমনকি ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জেরে বিক্ষোভ হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পেছনেও অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সংকটের ভূমিকা ছিল। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টেও এসব অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার কথা উঠে আসে। ২০১১ সালে এক গবেষণায় এমনটাই দেখা গেছে। ‘ফুড প্রাইসেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইনস্ট্যাবিলিটি’ নামের সেই গবেষণায় ১৯৭০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১২০টির বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। কেবল নিম্ন আয় ও উন্নয়নশীল দেশেই এমনটা ঘটছে, তা–ও নয়। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। আরও বলা হয়েছে, ‘২০২২ সাল থেকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বাংলাদেশিরা খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যস্ফীতিতে তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।’।

বর্তমানে বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের পর থেকে সবচেয়ে দীর্ঘ অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সংকট মিলে তৈরি হয়েছে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’। বিবিএস-এর তথ্যমতে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে ৫৪ শতাংশ, যেখানে একই সময়ে মজুরি সূচক বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় বাড়লেও তা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের সঞ্চয় কম বা আয় অনিশ্চিত, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পিপিআরসি ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে বসবাস করছেন, যারা সামান্য আঘাতেই দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকিতে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ পর্ব চলে ১৯৬৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী, জরিপটির আগের ১২ মাসে দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে ধার করেছে। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই চক্র রাজনৈতিক ফলাফলের ওপরও প্রভাব ফেলে। নরওয়ে ও সুইডেনের গবেষকদের ২০২৬ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক দেশে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে ১০ শতাংশ বিন্দু বেশি হলে সরকারবিরোধী উগ্র বা জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর ভোট গড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই সংকট কত দ্রুত কাটবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে খুব একটা আশার আলো নেই। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সাধারণ ভোটারদের ধৈর্য কতটুকু থাকবে এবং এই দুই বছরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ কতটা অসহায় পরিস্থিতির শিকার হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কেবল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নয়, বিনিয়োগের মন্দা কাটানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক ইচ্ছা ও বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া এই চাপ থেকে উত্তরণ কঠিন। কিন্তু, সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি থাকলেই যে সাড়ে ছ টাকার কেরোসিন তেল চব্বিশ টাকা বিক্রি করতে হবে তার পেছনে অতি মুনাফার লোভ ছাড়া অন্য কোন ন্যায়সঙ্গত যুক্তি নেই। এ ছাড়া এর পেছনে যে মজুতদার ব্যবসায়ী লালসা কাজ করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আয় পাল্লা দিতে পারেনি ব্যয়ের সঙ্গে। দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষ সব সময় অনুভব করে এসেছেন, কেন মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতিবিদেরা নীরব ঘাতক বলে থাকেন। আর এই চাপ কেবল জনজীবনে দুর্ভোগ আনে, তা নয়, রাষ্ট্রও বিপদে পড়ে।

শেয়ার করুন