১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশাহারা সাধারণ মানুষ, হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত

প্রকাশ:

বাজারে গিয়ে মাছ-মাংসের আকাশচুম্বী দাম শুনে খালি হাতে ফিরে আসছেন অনেকেই।

সন্তানের পছন্দের খাবার কেনার ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্য যেন তাতে বাধ সেধেছে।

নিত্যপণ্যের এই লাগামহীন দামের চাপে কেবল নিম্নবিত্ত নয়, পিষ্ট হচ্ছে মধ্যবিত্তরাও। কোনো কোনো পরিবারের খাবারের তালিকা থেকে মাছ-মাংস একেবারেই হারিয়ে গেছে, আবার কারও সংসারে চাল, ডাল আর আলুই হয়ে উঠেছে টিকে থাকার প্রধান ভরসা। এমনকি সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় দুধ কেনার টাকাও অনেক অভিভাবকের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় জিনিসও কিছুটা ত্যাগ করতে হচ্ছে। অনেকে প্রয়োজনের তালিকা ছোট করেছেন, কমিয়েছেন পণ্যের পরিমাণ।

কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জীবনসংগ্রামের এমন করুণ চিত্র পাওয়া গেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রব্যমূল্যের এই চাপ আর কেবল বাজারের তালিকার সীমাবদ্ধতা নয়, এটি পরিণত হয়েছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও মৌলিক নিরাপত্তার সংকটে। সীমিত আয়ের মানুষের আয়ের সঙ্গে বাজারের বাড়তি খরচের কোনো সামঞ্জস্য নেই। উল্টো অনেকের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় সঞ্চয়ে টান পড়েছে, কাটছাঁট করতে হয়েছে সন্তানের আবদার ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচে। সন্তানের আবদার পূরণ করা তো দূরের কথা, প্রয়োজনও ঠিকমতো মেটাতে পারছি না।’। সেই সীমা পেরিয়ে গেলে মানুষের পক্ষে আগের জীবনযাত্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রিফাতের পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। নিত্যপণ্যের বাড়তি দরের প্রভাব সরাসরি পড়েছে তার ব্যবসায়। তিনি জানান, আগে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হলেও এখন তা কমে প্রায় তিন হাজারে ঠেকেছে। ব্যবসা ও সংসার খরচ চালাতে গিয়ে প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই এখন বিলাসিতা মনে হয়। রিফাত বলেন, ব্যবসায় মন্দার কারণে এখন খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। আবেগের জায়গা থেকে সব সময় যেটা খেতে অভ্যস্ত, সেটাই খেতে চাই। কী করব, তিনটা সন্তান আছে, সংসার তো চালাতে হবে।’। টাকা দিয়েও সেবা না পাওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়।

রাস্তার ধারের আরেক দোকানি মিজানের ভাষ্য আরও করুন। দৈনিক ছয় থেকে সাতশ টাকা আয়ের বিপরীতে তার খরচ এখন সাত থেকে আটশ টাকায় পৌঁছেছে। তিনি জানান, নিম্নমধ্যবিত্তরা কারও কাছে হাত পাততে পারেন না, অথচ বাজারের হিসাব মেলাতে গিয়ে নাজেহাল দশা। সপ্তাহে দুবার মাছ-মাংসের স্বাদ গ্রহণও এখন তার জন্য বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না স্বল্প আয়ের মানুষ। মিজান বলেন, ‘আমরা নিম্নমধ্যবিত্তরা বেশি কষ্টে আছি।

মধ্যবিত্ত দম্পতিদের অভিযোগ, বাজারে প্রবেশ করলেই ন্যূনতম দুই হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেতনভোগী পরিবারগুলোর আয়ের অর্ধেকই ব্যয় হচ্ছে বাজারের নিত্যপণ্য কিনতে। পোশাক কারখানার মার্চেন্ডাইজার সাইফ বলেন, পণ্যের দাম সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আবেগ বা অভ্যাসের জায়গায় এখন নিজেদের চাহিদাকে সংকুচিত করতে হচ্ছে। আগে যেখানে কম টাকায় বেশি বাজার করা যেত, এখন বাড়তি দামে কেনাকাটা করতে গিয়ে অনেকেই খালি হাতে ফিরছেন। এরপর যাতায়াত ও অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় তো রয়েছেই।

পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রেতারা এখন হিসাব করে সীমিত পরিমাণে পণ্য কিনছেন। বিক্রেতা আহাদ আলী জানান, গত এক বছরে পাম তেল ও পোলাওয়ের চালের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগে ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় কেনা পাম তেল এখন ১৮৫ থেকে ১৮৬ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। মাছ বিক্রেতা শাকিলের মতে, তিন-চার বছর আগের ৩০০ টাকার বাজার এখন ৫০০ টাকায় সবজি কিনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তিন-চার বছর আগে ১৮০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে মোটামুটি ভালো পরিমাণে বাজার করা যেত। তিনি বলেন, ‘আগে সীমিত আয়েও চলতে পারতাম। তার ভাষ্য, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য চাল, ডাল, তেল, আলু—এই চারটি জিনিসের দাম কমলেই আমরা খুশি।

দিনমজুর আমীন আলীর আয়ের পথও সংকুচিত হয়েছে। আগে দিনে আটশ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারলেও এখন কাজ পাওয়া দুষ্কর। তিনি জানান, গরুর মাংস এখন শুধু ধনীদের খাবার। তার আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় বেঁচে থাকার নুন্যতম উপকরণ চাল ও ডালের পেছনে। আরেক মধ্যবয়স্ক বাবার আক্ষেপ, গ্যাস সংকটের কারণে রান্নার জন্য কাঠের চুলা বা কেরোসিন ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা খরচ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, সন্তানের জন্য দুধ কেনার টাকা নেই, সাবু জ্বাল দিয়ে খাওয়াতে হচ্ছে। ঘাটতি মেটাতে খাবারের খরচ কমানো ছাড়া উপায় নেই তার। একেবারে খাওয়া বন্ধ করার সুযোগ নেই, তাই কমিয়ে-বাড়িয়ে খেতে হচ্ছে।’। আমার আয় যদি ছয়-সাতশ টাকা হয় আর গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা, তাহলে এক কেজি গরুর মাংস কিনলে চাল-তেল কিনব কিভাবে।’। সংসারের টানাপোড়েনের সবচেয়ে নির্মম চিত্র উঠে আসে এক মধ্যবয়স্ক বাবার কথায়।

সংসারের ব্যয় সামলাতে বাধ্য হয়ে স্ত্রীকেও কাজে পাঠিয়েছেন সেলাইকর্মী মিলন। তিনি বলেন, সবকিছুর দাম নাগালের বাইরে যাওয়ায় সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন মনে করেন, বাড়তি দামের চাপ সচ্ছলরা সামলাতে পারলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। গ্যাস বিল দেওয়ার পরও নিরবচ্ছিন্ন সেবা না পাওয়াটা অনৈতিক বলেও তিনি মন্তব্য করেন। গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক গ্রাহক নিয়মিত গ্যাস না পেলেও বিল দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, পরিবহন খরচ ও হাতবদলের কারণে পণ্যের দাম বাড়ে। চালের মান ও ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে অধিদপ্তর কাজ করছে এবং ডিমের দামও এখন ক্রেতাদের সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

শেয়ার করুন