১৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তাহসিফ সাউরী মৃত্যুরহস্য: উত্তরার বারে দেখা সেই তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ

প্রকাশ:

বিমানবাহিনীর বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাূরীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নেমে এক তরুণীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের ১৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ তাকে ওই তরুণীর সঙ্গে দেখতে পাওয়া যায়। এদিকে ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে থাকা জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে নৌপুলিশ।

পুলিশ সূত্রে পাওয়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ওই বার ও রেস্টুরেন্টে মোটরসাইকেলে চেপে পৌঁছান তাহসিফ ও প্রায় ২৪-২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। এদিকে তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজ।

বারে প্রবেশের সময় ওই তরুণীর পরনে ছিল গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস এবং তার হাতে একটি সাদা পলিথিন ছিল।

সে সময় হেলমেট পরা অবস্থায় দীপও তাদের সঙ্গে ছিলেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করার পর তারা বেরিয়ে যান। পরবর্তীতে তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। তবে ওই তরুণী তাদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পুলিশ ধারণা করছে, ওই তরুণীকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হলে ঘটনার আগের চূড়ান্ত মুহূর্তগুলো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে পিবিআই দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় এবং তাকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। শুক্রবার রাতে তাকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই রাতেই তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম হেলাল বাদী হয়ে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। পরে সেই মামলায় দীপকে গ্রেফতার দেখানো হয়। শনিবার দুপুরে পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন জানালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। ঘটনাস্থলে তাহসিফের মোটরসাইকেল কীভাবে এলো, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের ভাসমান দেহ উদ্ধার করা হয়। পকেটে থাকা আইফোনের সহায়তায় পরিচয় নিশ্চিত করে পুলিশ। প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা যায়, ঘটনার রাতে তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ এবং প্রাথমিক বিচারে এ ঘটনার পেছনে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

নৌপুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, মাজার বস্তি এলাকায় পোশাক পরা দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে তারা দুদিকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। সে সময় তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। তবে ওই পুলিশ সদস্যরা কারা ছিলেন, কেনই বা ধাওয়া করেছিলেন এবং নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর ঠিক কী ঘটেছিল—সেসব তথ্যের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি। তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি কীভাবে ওই স্থানে পৌঁছাল, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নৌপুলিশ জানিয়েছে, দীপের দেওয়া বয়ানে নানারকম অসংগতি দেখা দেওয়ায় সব তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তার বক্তব্যে কিছু অসংগতি ও এলোমেলো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার পর কার কার সাথে দেখা করেছেন ও কোথায় সময় কাটিয়েছেন, সেই হিসাব বের করার চেষ্টা চলছে। তাহসিফের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং আলামত হিসেবে অন্যান্য জিনিসপত্র সংগ্রহের কাজ চলছে। সত্যিই পুলিশের ধাওয়ায় এই ঘটনা ঘটেছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য বা অপরাধমূলক পরিকল্পনা রয়েছে, তা রিমান্ড শেষে বিস্তারিত জানা যাবে। মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

অন্যদিকে তাহসিফের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘রাওয়া’। শনিবার দুপুরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে যান সংগঠনটির নেতারা। রাওয়ার যুগ্মসম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম জানান, পুরো ঘটনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে তারা দ্রুত সত্য উদ্ঘাটনের প্রত্যাশা করছেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিনও জানান, এই তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর তারা নজর রাখছেন। পরিবারকে কী ধরনের সহযোগিতা করা যায়, তা জানতে চেয়েছেন তারা। তারা আশা করছেন, দ্রুত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেয়ার করুন