চাঁদে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার ও স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন পারমাণবিক চুল্লি বসানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানুয়ারিতে ঘোষণা দেয়, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা চাঁদের বুকে একটি পারমাণবিক চুল্লি চালু করতে চায়। অন্যদিকে, চীনকে সঙ্গে নিয়ে ২০৩৬ সালের মধ্যে যৌথ মহাকাশ ঘাঁটিতে চুল্লি স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে রাশিয়া। মূলত মহাকাশ গবেষণা ও অনুসন্ধান অভিযানকে বহুদূর এগিয়ে নেওয়াই এই মেগা প্রকল্পের উদ্দেশ্য। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর নির্দেশ দেন। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রগুলোর বিস্তারিত জানায়নি।
তবে এ ধরনের উদ্যোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগও সৃষ্টি হচ্ছে। পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর খবরের পর মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি যোগাযোগ, জিপিএস ও গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, মহাকাশ অভিযানে তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনার বড় ধরনের ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে চুল্লিটি চালু হওয়ার পর কোনো কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফিরে এলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বর্তমান আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার নিয়মগুলো তৈরি করা হয়নি।
চাঁদে টিকে থাকার জন্য শক্তির বিকল্প উৎস হিসেবেই এই পরমাণু প্রযুক্তির ওপর ভরসা করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর গভীর গর্তে লাখ লাখ বছর ধরে জমে থাকা বরফ উত্তোলনে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। সেই বরফ গলিয়ে পানীয় জল, শ্বাস নেওয়ার উপযোগী অক্সিজেন এবং রকেটের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব। এছাড়া উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের মতে, চাঁদ থেকে সিলিকন, অ্যালুমিনিয়াম ও টাইটানিয়ামের মতো মূল্যবান খনিজ তুলে স্থানীয়ভাবেই স্যাটেলাইট তৈরি করা যেতে পারে। বরং উৎক্ষেপণের অনুমোদন, উৎক্ষেপণযানের প্রাপ্যতা এবং চাঁদের পৃষ্ঠে নিরাপদে অবতরণ ও ব্যবস্থা স্থাপন।’।
বিজ্ঞানীদের মতে, কেবল সৌরশক্তি দিয়ে চাঁদের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম চালানো অসম্ভব। চাঁদের কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে প্রায় দুই সপ্তাহ টানা সূর্যের আলো থাকলেও পরের দুই সপ্তাহ বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকে। যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গ জানান, ব্যাটারি বা ডিজেল পৃথিবী থেকে বয়ে নেওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই চাঁদের বরফ উত্তোলন ও ঘাঁটি সচল রাখতে তিন-চারটি পারমাণবিক চুল্লি চালানোই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। তবে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চাঁদের ঘাঁটিগুলো চালানো কঠিন। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পারমাণবিক প্রযুক্তি নয়। ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি।
নিজেদের লক্ষ্য পূরণে প্রযুক্তিগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ভিন্ন ভিন্ন নকশার চুল্লি পাঠাতে চায়। নাসা যে ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ তৈরির পরিকল্পনা করেছে, তার ওজন হবে ৬ হাজার কেজির কম এবং এটি ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। ৩.৭ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫.৫ মিটার প্রস্থের রকেটে বহনযোগ্য এই চুল্লিটি কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই অন্তত পাঁচ বছর নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে পারবে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রস্তাবিত পারমাণবিক চুল্লির নাম ‘সেলেনা’। ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার এই চুল্লিটির ওজন রাখা হয়েছে মাত্র ১,১০০ থেকে ১,৩০০ কেজির মধ্যে। তুলনামূলক হালকা হওয়ায় এটি খুব সহজে ও নিরাপদে চাঁদে অবতরণ করানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীনের নেতৃত্বাধীন লুনার ঘাঁটিতে যুক্ত হয়ে এই চুল্লিটি ১০ বছর পর্যন্ত সেবা দিতে পারবে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও একই ধরনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। গাজায় নিজের সেনাসন্তান নিহত হওয়াতেই কি রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন আইজেনকট। নেতানিয়াহুর জোট ছেড়ে বিরোধী জোটে যেতে আগ্রহী ইউটিজে।
মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ষাটের দশক থেকে আশির দশকের মধ্যে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন কক্ষপথে ৩০টির বেশি পারমাণবিক চুল্লি পাঠায়, যা দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা স্যাটেলাইটে ৩ থেকে ৫ কিলোওয়াট শক্তি সরবরাহ করা হতো। প্রায় ১ হাজার কেজি ওজনের এসব চুল্লিতে ইউরেনিয়াম পরমাণু ভেঙে তাপ ও বিদ্যুৎ তৈরি হতো, যা বর্তমানে নিষ্ক্রিয় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র গত ৭০ বছরে মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি গবেষণায় ২ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করলেও তাদের একমাত্র সাফল্য ছিল ১৯৬৫ সালে। সে বছর একটি টেস্ট স্যাটেলাইটে পারমাণবিক চুল্লি চালু করা হলেও ৪৩ দিনের মাথায় একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে চুল্লিটি বন্ধ হয়ে যায়। সেটি এখনো অকেজো অবস্থায় মহাকাশে ভাসছে। পরবর্তীতে বাজেটের অগ্রাধিকার পরিবর্তনের কারণে নাসার আরও কয়েকটি প্রকল্প বাতিল হয়। তবে ১৯৬৫ সালের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প ছাড়া দেশটি কখনো সফলভাবে মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠাতে পারেনি।
চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হবে পৃথিবী থেকে। প্রথমে এখানে চুল্লি তৈরি করে রোবোটিক মহাকাশযানের মাধ্যমে চাঁদে পাঠানো হবে এবং সেখানে রকেট ইঞ্জিনের সাহায্যে অবতরণ করানো হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুটি দেশই জানিয়েছে, উৎক্ষেপণ ও ভ্রমণের সময় চুল্লিগুলো পুরোপুরি বন্ধ রাখা হবে। কারণ অব্যবহৃত ইউরেনিয়ামে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কম থাকে।
তবে চুল্লি চালুর পর দুর্ঘটনার ইতিহাস আগে থেকেই রয়েছে। ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক চুল্লিসমৃদ্ধ ‘কসমস ৯৫৪’ স্যাটেলাইটটি বিকল হয়ে পৃথিবীতে ভেঙে পড়েছিল। এতে কানাডার উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়েছিল, যা পরিষ্কার করতে পরবর্তীতে বিশাল সামরিক অভিযান চালাতে হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাঁদের বুকে এমন দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতি নির্দিষ্ট সীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি মহাকাশের এই দৌড়ে প্রবল ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও কাজ করছে। ২০১৫ সালের পর ট্রাম্প প্রশাসন ও পরবর্তীতে বর্তমান প্রশাসন ২০৩০ সালের সময়সীমাকে সামনে রেখে এগোচ্ছে। তবে প্রযুক্তিবিদদের মতে, চুল্লি তৈরি করার চেয়ে মহাকাশে পাঠানো এবং নিরাপদে ল্যান্ড করানোই হবে মূল পরীক্ষা। আগস্টে মার্কিন পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, এই মহাকাশ প্রতিযোগিতায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বী চীন।
আইনি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিক মহাকাশ চুক্তি অনুসারে মহাকাশে কোনো দেশের ভূখণ্ডগত মালিকানা স্বীকৃত নয়, তবে পাঠানো যন্ত্রপাতির ওপর নিজস্ব অধিকার থাকে। লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের পরিচালক আন্তোনিনো সালমেরি জানান, ক্ষতিকর দূষণ এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হলে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানো সম্পূর্ণ আইনসম্মত। প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী নরবার্ট শর্গোফার বলেন, চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সব দেশেরই খনিজ উত্তোলনের অধিকার আছে। তবে কোনো দেশ বরফ সমৃদ্ধ অঞ্চলে তেজস্ক্রিয়তার দোহাই দিয়ে ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ ঘোষণা করলে বাস্তবে অন্য দেশগুলোর সেখানে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলো উপগ্রহ ধ্বংস করার অস্ত্র নয়; বরং যোগাযোগে বাধা সৃষ্টিকারী যন্ত্র হতে পারে। বরফ থেকে পাওয়া পানি চাঁদে বসবাস ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করা যাবে। এটি সরাসরি ভূখণ্ডের মালিকানা দাবি নয়।





