১৩ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যানজট, জনভোগান্তি চরমে: সাঁথিয়ায় মহাসড়ক দখল করে রমরমা বাণিজ্য

প্রকাশ:

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র বনগ্রাম বাজারে ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক ও এর পাশের ফুটপাত দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ অস্থায়ী হাট। প্রায় সিকি কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলা এই বেআইনি বাণিজ্যের কারণে বাজারটিতে সবসময় যানজট লেগেই থাকে। রাস্তা দখল করে গড়ে ওঠা এসব দোকানের আড়ালে চলছে নামমাত্র ‘খাজনা’ আদায়ের নামে চাঁদাবাজি। নিয়মিত ঘর ভাড়া না দিয়ে অবৈধভাবে ফুটপাতে ব্যবসা চালিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন, যা অনেক বৈধ দোকানের চেয়েও বেশি। এদের কাছ থেকে নেপথ্যে ‘ খাজনা’র নামে চাঁদাবাজি করে একটি চক্র। সরেজমিনে বনগ্রাম বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা – পাবনা মূলমহাসড়কের ওপরই কাঁচাবাজার, ফলের দোকান, মাংসের দোকান এবং গরম তেলের কড়াই স্থাপন করে ভাজাপোড়ার দোকানসহ হরেক রকমের ব্যবসায়িক স্থাপনা বসানো হয়েছে। মহাসড়ক দখলকারী এই ব্যবসায়ীদের অনেকরই দৈনিক আয় ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত, যা বাজারের অনেক বড় ব্যবসায়ির চেয়েও বেশি। কিন্তু দখলদার ব্যবসায়ীরা সেই সাইনবোর্ডটির ওপরই চালা দিয়ে নির্বিঘ্নে দোকান চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক জিনিস রাস্তায় পাওয়া যায় বলে ক্রেতারা অনেক সময় দোকানে আসে না।

স্থানীয়দের মতে, রূপালী ব্যাংক সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বাজার থাকলেও সম্প্রতি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মোড় ও ফুটপাত দখল করে নতুন করে হাট বসিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্থানে সাধারণ বাজারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে নিত্যপণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। এই অবৈধ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে তারা প্রভাবশালী মহলের পকেটে চাঁদা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এদিকে, যারা নিয়মিত দোকান ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছেন, তারা এই অবৈধ দখলের ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। একই রকম অভিযোগ বনগ্রামের বাসিন্দা আ।

বনগ্রাম বাজারের ওপর দিয়ে প্রতিদিন বনগ্রাম প্রাইমারি স্কুল, মিয়াপুর হাই স্কুল ও কলেজ, মিয়াপুর দাখিল মাদ্রাসা এবং স্থানীয় কয়েকটি কিন্ডারগার্টেন ও প্রাইভেট মাদ্রাসার অন্তত ৭ থেকে ৮ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। এতে একদিকে এলাকার ৭- ৮ হাজার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ জনগনণর চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। বনগ্রাম বাজারের ওপর দিয়ে প্রতিদিন বনগ্রাম প্রাইমারি স্কুল, মিয়াপুর হাই স্কুল ও কলেজ, মিয়াপুর দাখিল মাদ্রাসা, ৫-৬টি কিন্ডারগার্টেন, ৪-৫টি প্রাইভেট মাদ্রাসা এবং বনগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মিলিয়ে প্রায় ৭- ৮ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। বিশেষ করে শনি ও মঙ্গলবার হাটের দিন পরিস্থিতি চরম ভয়াবহ রূপ নেয়।

এছাড়া বনগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদেরও এই ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া খাতুন জানায়, রাস্তার ওপর দোকানপাট ও জনসমাগমের কারণে স্কুলে যাতায়াতে সবসময় আতঙ্ক কাজ করে। একই সুর শোনা যায় ৯ম শ্রেণির ছাত্রী আফিফার কণ্ঠে, তার মতে ভিড় ঠেলে রাস্তা পার হওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ এবং হাটের দিনগুলোতে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ৮ম শ্রেণির ছাত্রী মারিয়া খাতুন জানায়, রাস্তার ওপর দোকানপাট আর মানুষের ভিড়ের কারণে তাদের স্কুলে যেতে অনেক ভয় লাগে, কারণ সেখানে সবসময় একটা জটলা লেগেই থাকে।

কেবল শিক্ষার্থীরাই নয়, স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষও চরম বিড়ম্বনায় পড়েছেন। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম পেঁয়াজের হাট হওয়ায় পেঁয়াজবাহী যানবাহন এবং গবাদি পশুর হাট থাকায় গরু ব্যবসায়ীদের চলাচলেও মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। স্থানীয় হাটুরিয়া বাচ্চু প্রামানিক ক্ষোভের সঙ্গে জানান, সামান্য রাস্তা পার হতে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এছাড়া জসীম উদ্দিন, সাগর হোসেন এবং হাবিবুর রহমানের মতো স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, যানজটের কারণে জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়া কিংবা কৃষি পণ্য সময়মতো গন্তব্যে পাঠানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাইনবোর্ড উপেক্ষা করেই দখলদাররা তাদের দোকানের চাল তৈরি করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। অতীতে প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও দীর্ঘ বিরতিতে আবার সব আগের অবস্থায় ফিরেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দখলকারীরা আর্থিকভাবে অসচ্ছল নন, বরং সিন্ডিকেট করে তারা জায়গা দখল করে রেখেছেন। উচ্ছেদের কথা উঠলে প্রভাবশালী মহল প্রশাসনের কাজে বাধা দেয়, যার ফলে দুর্ভোগের অবসান ঘটছে না। ইতোমধ্যে এই যানজটের কারণে বেশ কয়েকটি ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটেছে। মহাসড়কের পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ ) একটি সাইনবোর্ড রয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে লেখা আছে — সড়কের উভয় পাশের ১০ মিটারের মধ্যে দোকানপাট বা কোনো কিছু রাখা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

মহাসড়কের ওপর দোকান বসানো এক ব্যবসায়ী জানান, নিজস্ব দোকানের মাসিক ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিলের খরচ বাঁচাতেই তারা দিনে ৫০ টাকা চাঁদা দিয়ে ফুটপাতে ব্যবসা করছেন। স্থানীয় সচেতন মহল এবং অভিভাবকরা জনস্বার্থে ও মহাসড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে অবিলম্বে এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন। এজন্য দিনে ৫০ টাকা চাঁদা দিয়ে তিনিএমন সহজভাবে দোকান চালাচ্ছেন।

এ বিষয়ে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিজু তামান্না জানান, বিষয়টি তার নজরে ছিল না। তবে জনভোগান্তির বিষয়টি তিনি গুরুত্বসহকারে দেখছেন এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী মনসুরুল আজিজ জানান, বিষয়টি তিনি অবগত নন। তিনি এ ব্যাপারে তার অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন।

শেয়ার করুন