কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন শাহর আখড়াবাড়ি থেকে টাইম বোমা উদ্ধারের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ করছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত অপরাধে কারও স্পষ্ট যোগসূত্র নিশ্চিত করা যায়নি। যে টিস্যু ব্যাগের ভেতর বোমাটি রাখা ছিল, সেটি পাশের এক জেলার মিষ্টির দোকানের। পুলিশ এখন সেই ব্যাগের ঠিকানার ওপর ভিত্তি করে নতুন করে তদন্ত জোরদার করেছে। বোমাটি তৈরির সরঞ্জামাদি জব্দ তালিকায় রাখা হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যে নির্দিষ্ট স্থানে ব্যাগটি পড়ে ছিল, তার পাশেই একজন অস্থায়ী চা বিক্রেতার দোকান ছিল। রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার পর সেই ব্যাগ দেখে প্রথমে তাঁরই সন্দেহ হয়। পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়। তবে ঘটনার পর থেকে ওই চা বিক্রেতা নিখোঁজ রয়েছেন। পুলিশ তদন্তের প্রয়োজনে তাঁর সন্ধান চালাচ্ছে। পুলিশ তদন্তের স্বার্থে তাঁকে খুঁজছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার পর থেকেই বিরতিহীনভাবে তদন্ত চালাচ্ছেন তাঁরা।
বাৎসরিক উৎসবের দ্বিতীয় দিন রাত দেড়টার দিকে আখড়াবাড়ির ভেতরে বোমা থাকার তথ্য পেয়ে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ। পরদিন সকালে ঢাকা থেকে পুলিশের স্পেশাল রেসপন্স ইউনিটের (এসআরইউ) বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল এসে তা নিষ্ক্রিয় করে। তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই কেউ ব্যাগটি খোলার চেষ্টা করায় সেটির তারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে বড় ধরনের বিস্ফোরণ এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লালন শাহর তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান গত সোমবার মধ্যরাতে শেষ হয়েছে। তবে বোমা উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধু-ভক্তদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয় এবং সোমবার সকালের মধ্যেই আখড়াবাড়ি প্রায় খালি হয়ে যায়। এ ঘটনায় কুমারখালী থানায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাটির পর লালনের আখড়াবাড়িতে বিজিবি মোতায়েনও করা হয়।
পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভেড়ামারা সার্কেল) দেলওয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল কাজ করছে। তাঁদের সহায়তা করছেন ঢাকা থেকে আসা এসআরইউর দুজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। আখড়াবাড়িতে বসানো শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা ও পুলিশের বডি-ওর্ন ৪৫টি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ভিডিও ফুটেজ ও আনুষঙ্গিক তথ্য বিশ্লেষণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, রাত ১০টা থেকে ১২টার মধ্যে যেকোনো সময়ে চালু অবস্থায় বোমাটি রেখে যাওয়া হয়। বোমাটি তৈরিতে একটি রিচার্জেবল ব্যাটারি, কিছু তার, একটি সার্কিট, দুটি আতশবাজি এবং টিস্যুতে মোড়ানো দিয়াশলাইয়ের কাঠি ও পেট্রলের বোতল ব্যবহার করা হয়েছিল। সার্কিটের টাইমিং অনুযায়ী আতশবাজিতে আগুন ধরে পেট্রলে বিস্ফোরণ ঘটানোর পরিকল্পনা ছিল। পুলিশ বলছে, সার্কিটে নির্ধারণ করা সময়ে আতশবাজি ফেটে পাশে থাকা পেট্রলের বোতলে আঘাত করতে পারত। আশা করা যাচ্ছে, খুব দ্রুত সময়ে কিছু একটা পাওয়া যাবে।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, স্থানীয়ভাবে কোনো অদক্ষ হাতে এটি তৈরি করা হতে পারে। লালনের ভাবাদর্শের বিরোধী কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ঘটনা ঘটাতে চেয়েছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, বোমায় কোনো স্প্লিন্টার ছিল না। তবে পেট্রলের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বড় ধরনের প্রাণহানি ও হুড়োহুড়িতে হতাহতের চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে দ্রুতই মূল অপরাধীদের শনাক্ত করার আশা করছে পুলিশ। দগ্ধ ও হুড়োহুড়িতে প্রাণহানির শঙ্কা ছিল।





