৪ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এখনও আসা বাকি

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এখনও আসেনি বলে সতর্ক করেছেন কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। তার আশঙ্কা, আগামী দিন ও মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর আরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। কাতারের কাছ থেকে যেভাবে বিমান উপহার পেয়েছিলেন ট্রাম্প।

সোমবার কাতার দোহায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ সতর্কবার্তা দেন আল থানি, যিনি একই সাথে কাতারের প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বেও রয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে আমরা এখনও মূল সংকটের চূড়ায় পৌঁছাইনি। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে এর আরও ব্যাপক ও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।

উপসাগরীয় নিরাপত্তা ও হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি

কাতারসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের সামনে থাকা বিভিন্ন নিরাপত্তাঝুঁকি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন উপ-প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, বিদ্যমান ঝুঁকির মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় বিঘ্নের আশঙ্কা প্রধান হয়ে উঠেছে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক হামলা এবং এর জবাবে তেহরানের পক্ষ থেকে অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা হামলার পর থেকেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে তীব্র অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট এটি। এ পথে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি সাধারণ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রাস লাফানে হামলা ও আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার

গত মার্চে কাতারের রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্সে ইরানের সরাসরি হামলায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব শিল্প অবকাঠামো পুরোপুরি মেরামত করতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা প্রকাশ করা হচ্ছে। ওই হামলার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি স্বীকার করেন, কাতার এ ঘটনায় অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিল।

তবে তিনি জানান, ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরও তেহরানের সঙ্গে দোহার কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ওই হামলা থেকে কাতার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছে উল্লেখ করে আল থানি বলেন, ভবিষ্যতে যেকোনো সম্ভাব্য বা অপ্রত্যাশিত হামলা থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

উপ-প্রধানমন্ত্রী আরও নিশ্চিত করেন, মার্চের শুরুর দিকে একটি হামলার সময় কাতারি বাহিনী সফলভাবে ইরানের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়। কাতার এখন জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোনবিরোধী প্রযুক্তি এবং সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একই সাথে একটি নতুন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন তিনি। শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে জানালেও কোন কোন দেশ এতে যুক্ত থাকছে তা স্পষ্ট করেননি। আল থানি বলেন, আজ আমি আনন্দের সঙ্গে আরও ঘোষণা করছি, শিগগিরই আমরা একটি নতুন অংশীদারিত্বের ঘোষণা দেব।

হরমুজ প্রণালিতে ট্রানজিট ফি আরোপের তীব্র বিরোধিতা

কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর কোনো ধরনের টোল বা ট্রানজিট ফি আরোপের প্রচেষ্টার জোরালো বিরোধিতা করেন কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক নৌপথে কোনো ট্রানজিট ফি আরোপ করা একেবারেই অনুচিত। এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা ও বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত বিশ্বের সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

মধ্যস্থতা ও টেকসই আঞ্চলিক সংঘাত নিরসন

ইরানের হামলার ঘটনা সত্ত্বেও তেহরানের সঙ্গে কাতার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেনি বলে জানান আল থানি। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। হামলার আগেও ইরানের সঙ্গে দোহার সম্পর্ক একটি সুদৃঢ় আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, বিশেষ করে যৌথ সমুদ্রতলীয় গ্যাসক্ষেত্র এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্বার্থের কথা তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, আমরা কখনোই যোগাযোগ বন্ধ করি না।

সংকট নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন

  • যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরাইলসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কাতার, পাকিস্তান ও ওমানের যৌথ মধ্যস্থতা সফল হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
  • তবে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জন্য আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনমূলক সংলাপের আয়োজন করা আবশ্যক।
  • এই সংলাপে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশসমূহ, পাকিস্তান ও তুরস্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মিত্রদের সমন্বিতভাবে যুক্ত করতে হবে।
  • অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন করা জরুরি।

ভবিষ্যতে সংঘাত এড়িয়ে চলার লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা বলেন কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে কয়েক দশকের দীর্ঘ বৈরিতা পেছনে ফেলে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক সহযোগিতার উদাহরণ দেন তিনি। আল থানি বলেন, ইরান আমাদের নিকট প্রতিবেশী, তাই তাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানের পথ আমাদের নিজেদেরই খুঁজে বের করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ও আল উদেইদ ঘাঁটি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাতারের দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল থানি জানান, গত তিন থেকে চার দশকে যৌথ সামরিক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুবাদে সাম্প্রতিক ৯০ শতাংশের বেশি আকাশ হামলা সফলভাবে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।

একই সাথে কাতারে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ আল উদেইদ বিমান ঘাঁটির সার্বিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ জোরকদমে চলছে। এই মার্কিন ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি অন্যান্য মিত্র দেশের সদস্যরাও অবস্থান করছেন, যেখানে চলমান সংঘাতের সময় ইরান হামলা চালিয়েছিল।

বক্তব্যের শেষে কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে মধ্যস্থতা আর আত্মরক্ষা দুটি আলাদা বিষয়। তার ভাষায়, কূটনৈতিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়ার অর্থ এই নয় যে নিজেদের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রস্তুতি থাকবে না; যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাতার পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

শেয়ার করুন