বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে বাঘ ও মানুষের প্রাণঘাতী সংঘাত এড়াতে বন বিভাগ এক অনন্য উদ্যোগ নিয়েছে। বনের সংলগ্ন লোকালয় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নাইলনের তৈরি বিশেষ বেড়া স্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে বন বিভাগের নেওয়া তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে সুন্দরবনের চারপাশ ঘিরে ৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বেড়া নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ধানসাগর, কৈখালী ও কৈলাশগঞ্জের মতো বনের সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে এই শক্ত নাইলন জাল কার্যকর সুরক্ষা দিচ্ছে। হালকা ও টেকসই এই নাইলনের বেড়া বননির্ভর জনগোষ্ঠীর চলাচল আছে এমন নির্দিষ্ট কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বর্তমানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ১২৫টি। এই বনের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মৌয়াল, বাউয়ালি ও মাছ শিকারি জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ ও বাঘের মধ্যে দ্বন্দ্ব একটি বড় সংকটে পরিণত হয়েছিল। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত প্রায় ২০ বছরে (২০০০ সাল থেকে) সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘ ও মানুষের দ্বন্দ্বে আনুমানিক ৩০০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৮টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া, মানুষের ওপর বাঘের আক্রমণের ১৭২ থেকে ৩২৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। কাজের প্রয়োজনে তাদের প্রায়ই বাঘের বিচরণক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হয়। বনের সীমানার কাছাকাছি মানুষের ঘুমানো, রান্না করা বা খাবার জমা রাখার কারণে এলাকাগুলো বাঘের আক্রমণের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুন্দরবন হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল ও বিচরণ ক্ষেত্র। শীর্ষ শিকারি হিসেবে সুন্দরবনের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু একই সাথে এই বন অনেক মানুষের জীবিকার সংস্থান করায় মানুষ ও বন্যপ্রাণীকে পুরোপুরি আলাদা রাখা প্রায় অসম্ভব। যেহেতু স্থানীয় জনগোষ্ঠী জীবিকার জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল, তাই নাইলনের বেড়ার মতো কম খরচের প্রযুক্তি বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতে বাস্তবসম্মত পথ দেখাতে পারে। সংরক্ষণবিদদের মতে, এখান থেকে মূল শিক্ষণীয় বিষয় হলো- মানুষ রক্ষা আর বাঘ বাঁচানো দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, নাইলনের বেড়া স্থাপনের পর থেকে লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার ঘটনা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের পর থেকে এ ধরনের আর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। এই বেড়া মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক বাধা হিসেবে কাজ করে, যা বাঘকে লোকালয়ের দিকে আসতে নিরুৎসাহিত করে। বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদের মতে, গত চার-পাঁচ বছরে মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্বের হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে।
স্থায়ী কংক্রিটের দেয়ালের বদলে কেন এই নাইলনের জাল বেছে নেওয়া হয়েছে, তার ব্যাখ্যায় বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, সুন্দরবনের ভৌগোলিক পরিবেশ অত্যন্ত নাজুক। জোয়ার-ভাটা, কাদা ও ঋতু পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলা এই বেড়াগুলো প্রয়োজনে দ্রুত সরিয়ে ফেলা বা পুনর্স্থাপন করা যায়। এটি ম্যানগ্রোভের বাস্তুতন্ত্রের কোনো ক্ষতি করে না। বিশেষ করে যেখানে বাউয়ালিরা অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে থাকেন, সেখানে এই বেড়া তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। চিরাচরিত দেয়াল তৈরি করা যেখানে অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল, সেখানে এই নাইলন জালের বহু ব্যবহারিক সুবিধা রয়েছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বেড়া বাঘের চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে কিন্তু তাদের কোনো ক্ষতি করে না। তবে পরিবেশবিদ ও সংরক্ষণবাদীরা এই কৌশলের বিষয়ে কিছু সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। তাদের মতে, বেড়াটি এমনভাবে স্থাপন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন যাতে কোনো বন্যপ্রাণী এতে আটকে না যায় বা শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। এটি বাঘের স্বাভাবিক চলাচলের পথে অহেতুক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে কি না, তাও সার্বক্ষণিক তদারকি করা জরুরি। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলেও কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। তবে এর সফলতা নির্ভর করে সঠিক উপায়ে বেড়া স্থাপন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বনে আসা মানুষের সতর্ক আচরণের ওপর। বাঘ কেবল এই বেড়া এড়িয়ে অন্য দিক দিয়ে লোকালয়ে আসছে নাকি প্রকৃতপক্ষে মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা কমছে- তা নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাহিদা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বন বিভাগের মতে, শুধু একটি নাইলনের বেড়ায় এই সমস্যার পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা প্রদান, বনজীবী মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত টহল ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বন ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুন্দরবনকে রক্ষা করাই এই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য।





