৩০ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদির কিং খালিদ বিমানবন্দরে হুতি হামলা: ১৩ জনের মৃত্যু

প্রকাশ:

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের এক প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং অন্তত ৩০০ জন আহত হয়েছেন। এই ভয়াবহ ঘটনাটি উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান আঞ্চলিক অস্থিরতাকে এক নতুন ও সংকটময় মোড় দিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সংঘাত শুরুর পর থেকে এটিই ছিল কোনো উপসাগরীয় দেশে সবচেয়ে বড় ও মর্মান্তিক হতাহতের ঘটনা। সৌদি আরব সাধারণত এ ধরনের বিশাল ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে অভ্যস্ত নয়, তাই এই হামলার পর দেশটিতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত জানা গেছে, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হয়েছেন। হতবিহ্বলজনক এই বিপুল মৃত্যু সেখানে এক রক্তাক্ত প্রতিশোধের আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। দোহারের আকাশ আর চারদিকে ছড়ানো স্প্লিন্টারের সেই দৃশ্য ছিল কাতারিদের জন্য এক তীব্র হতাশার মুহূর্ত।

গত এক বছরে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় যে ধস নেমেছে, তা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। যদিও গাজা বা ইরানের যুদ্ধের তুলনায় এখানে হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কম, তবে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে নিরাপত্তার এই অবক্ষয় শাসকদের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছর খানেক আগে যখন ইরানের পরমাণু স্থাপনায় মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় কাতারের মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, তখন থেকেই এই নতুন অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল। প্রথম দর্শনে এটি কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। প্রথম অভাবনীয় ও দুঃসাহসিক ঘটনাটি ঘটেছিল ঠিক এক বছর আগে। তবে তখনও ইরানের পক্ষ থেকে কিছুটা সতর্কবার্তা ও সমন্বয় ছিল, যা নির্দেশ করছিল– এটি কেবল মুখ রক্ষার একটি পদক্ষেপ।

২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়, যখন কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই ইসরায়েল দোহায় হামলা চালায়। সেই ঘটনায় পাঁচ ফিলিস্তিনি ও একজন কাতারি নাগরিক প্রাণ হারান। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা ভেঙে যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা এবং ইরানের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইরান সংঘাত উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে সরাসরি দাবানলের মধ্যে টেনে আনে।

তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমানের সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি কেন্দ্র ও পানি শোধন প্লান্ট লক্ষ্য করে আঘাত হানে। এসব অবকাঠামো ওই দেশগুলোর অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন, বিমানবন্দর বন্ধ থাকা এবং আকাশসীমা অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। উপসাগরীয় শাসকদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল অঞ্চলটিকে পর্যটন, খেলাধুলা ও বিনোদনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত করা, কিন্তু এই হামলায় তাদের বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও ভাবমূর্তি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।

এই অস্থিতিশীলতার পেছনে রয়েছে ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ। সংখ্যালঘু শিয়া অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করলে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। ২০১৫ সালে সৌদি জোট হুতিদের দমনে বড় ধরনের অভিযান চালায়, যা পরবর্তীকালে চরম মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়। ২০২২ সালে যুদ্ধ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও, হুতি ও সৌদি-সমর্থিত সরকারের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি এবং দেশটি কার্যত দ্বিধাবিভক্ত রয়ে গেছে। এরপর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত একটি জোট হুতিদের উৎখাত করতে এক নির্মম সামরিক অভিযান শুরু করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে গাজার পরিস্থিতি ও লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি হুতিদের এই পুনরুত্থান পুরো অঞ্চলকে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। পুরোনো মিত্রতা ব্যবস্থা এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং নতুন ধরনের শত্রুতার মুখে পড়ে উপসাগরীয় দেশগুলো এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। গার্ডিয়ানের কলাম লেখক নাসরিন মালিকের বিশ্লেষণে এই নতুন সংকটময় যুগের চিত্রই ফুটে উঠেছে।

শেয়ার করুন