২৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামলা ও অস্থিরতায় মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে তীব্র সংকট

প্রকাশ:

সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সৌদি আরবসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রবাসীদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঢাকা থেকে রিয়াদসহ বিভিন্ন রুটে ইতিমধ্যে ৮২টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ফলে বহু নতুন ও পুরনো প্রবাসী কর্মী সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে ঢাকায় আটকে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি সৌদির বিমানবন্দরে হামলায় বাংলাদেশি কর্মীর হতাহতের ঘটনার পর প্রবাসী ও বিদেশ গমনেচ্ছুদের মাঝে উৎকণ্ঠা চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়তে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আহরণের সবচেয়ে বড় উৎস হলো সৌদি আরব। ফলে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। প্রবাসী আয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি থেকে দেশে ৫৮৪ কোটি ৯১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের (৪২৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলার) তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ বেশি। ঐ অর্থবছরে দেশের মোট রেমিট্যান্স এসেছিল ৩,৫৫৯ কোটি ডলার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সৌদি আরব থেকে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার, যা মোট প্রবাস আয়ের ১৯.২ শতাংশ। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৭ কোটি ৭৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এই অঙ্ক ছিল ৪২৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলার। সেই হিসাবে মোট রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশটি থেকে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি। কর্মীরা যেমন যেতে পারছেন না, যারা দেশটিতে আছেন, তারাও হতাহত হচ্ছেন।

সৌদিতে ব্যবসা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডেও যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব পড়ছে। দেশটির এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী শহীদুল জানান, বিমানবন্দর ও অন্যান্য স্থানে হামলার কারণে পর্যটক কমে যাওয়ায় দীর্ঘ দিন তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে আয় এক প্রকার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি দেশে পরিবারকে টাকা পাঠাতে পারছেন না। এই বাস্তবতা কেবল একজন শহীদুল নয়, হাজার হাজার কর্মীর আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাব মতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ড ১১ লাখের বেশি মানুষ বিদেশে চাকরি নিয়ে গেছেন, যার মধ্যে সাড়ে সাত লাখের বেশি (৭,৫৫,১৯৪ জন) গেছেন কেবল সৌদি আরবে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া গত বছর কাতারে ৪২,৫১৬ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০,৬৬১ জন, কুয়েতে ২০,২৫৪ জন, জর্ডানে ১০,০১০ জন এবং ইরাকে ২,৮৭৮ জন বাংলাদেশি গেছেন। তবে চলতি বছরে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কর্মী পাঠানোর গতি মারাত্মকভাবে কমে এসেছে। ২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদিতে গেছেন ২,০১,৩৬১ জন কর্মী, যা আগের বছরের একই সময়ের (৪,৫০,৯০৭ জন) চেয়ে ৫৫ শতাংশ কম। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে মোট কর্মী গমন গত বছরের ৮,৫১,০৯৫ জন থেকে ৩২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫,৭৮,৫৯৭ জনে। চলতি বছরের ১০ই অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্ব জুড়ে বাংলাদেশ থেকে মোট ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৭ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের (৮ লাখ ৫১ হাজার ৯৫ জন) তুলনায় ৩২ শতাংশ কম। আশা করছি, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়বে।

প্রবাসী কর্মীদের এই সংকটের প্রভাবে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবারের আবাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক কর্মী ভিটেমাটি বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, কিন্তু ফ্লাইট বাতিল ও সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় তারা চরম ঋণের বোঝা ও আর্থিক চাপে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি নতুন কর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুতই গতি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক উল্লেখ করেন, যুদ্ধের কারণে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও এই প্রতিকূলতার মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়েছে।

অন্যদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে প্রবাসীরা চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরলে রেমিট্যান্স আয় বড় ধাক্কা খাবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিকল্প আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার অনুসন্ধানের চেষ্টা চালাচ্ছে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান মনে করেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এককভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশেষ করে সৌদিনির্ভর ছিল। সংঘাতের কারণে সেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও নতুন চাকরির সুযোগ কমবে। তিনি পরামর্শ দেন, সংকট মোকাবিলায় বেকারত্ব ও রেমিট্যান্স ধস এড়াতে সরকারের উচিত অবিলম্বে সৌদির সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা এবং একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা।

শেয়ার করুন