১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামের আলোকে প্রবীণদের প্রতি করণীয় ও মর্যাদা

প্রকাশ:

মানব জীবনের স্বাভাবিক চক্র হলো শৈশব, কৈশব ও যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে উপনীত হওয়া। পবিত্র কুরআনের সুরা নাহলের ৭০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, তিনিই মানুষকে দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করেন এবং শেষ বয়সে মানুষকে জরাগ্রস্ত করে দেন, যেখানে অনেক কিছুই মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। একইভাবে সুরা রুমের ৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ দুর্বলতা থেকে শক্তি এবং পুনরায় শক্তি থেকে বার্ধক্যের দুর্বলতায় ফিরে আসে। এটিই আল্লাহর অমোঘ বিধান। ফলে জানার পরেও সে আর কিছুই জানবে না (অর্থাৎ জানা জিনিস ভুলে গিয়ে শিশুর মতো হয়ে যাবে)। অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য।

প্রবীণদের মর্যাদা ও ফজিলত

ইসলামে বয়োজ্যেষ্ঠদের অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়। আমর বিন শুআইব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, সাদা চুলবিশিষ্ট মুসলিমের মর্যাদা আল্লাহ বৃদ্ধি করে দেন এবং তাদের পাপ মোচন করে পুণ্য লিখে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন এই শুভ্রকেশ মুমিনের জন্য আলোর কারণ হবে। প্রবীণদের সম্মান করা মূলত মহান আল্লাহকেই সম্মান করার নামান্তর। রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, প্রবীণদের উপস্থিতিতেই বরকত ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। হাদিসে আরও এসেছে, দীর্ঘায়ু লাভ করে যারা নেক আমল করেন, তারাই উত্তম মানুষ হিসেবে গণ্য হন। শুভ্রকেশবিশিষ্ট বৃদ্ধ মুসলিমের বিশেষ মর্যাদার বিষয়ে আমর বিন শুআইব বর্ণনা করেন, ‘যদি কেউ সাদা চুলবিশিষ্ট হয়, আল্লাহ তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন, পাপ মোচন করে দেন এবং একটি পুণ্য লিখে দেন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৬৯৩৭; আবু দাউ। বলেন, ‘যে মুসলিম সাদা চুলবিশিষ্ট হবে, কিয়ামতের দিন এটা তার জন্য জ্যোতি বা আলো হবে।’ (তিরমিজি: ১৬৩৪)। ‘নিশ্চয় শুভ্রচুলবিশিষ্ট মুসলিমকে সম্মান করাই আল্লাহকে সম্মান করার শামিল।’ (আবু দাউদ: ৪৮৪৩)। ‘প্রবীণদের সঙ্গেই তোমাদের ক। শুভ্রকেশবিশিষ্ট বৃদ্ধ মুসলিমের বিশেষ মর্যাদার বিষয়ে আমর বিন শুআইব বর্ণনা করেন, ‘যদি কেউ সাদা চুলবিশিষ্ট হয়, আল্লাহ তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন, পাপ মোচন করে দেন এবং একটি পুণ্য লিখে দেন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৬৯৩৭; আবু দাউদ: ৪২০২; ইবনু মাজাহ: ৩৭২১)। বলেন, ‘যে মুসলিম সাদা চুলবিশিষ্ট হবে, কিয়ামতের দিন এটা তার জন্য জ্যোতি বা আলো হবে।’ (তিরমিজি: ১৬৩৪)। ‘নিশ্চয় শুভ্রচুলবিশিষ্ট মুসলিমকে সম্মান করাই আল্লাহকে সম্মান করার শামিল।’ (আবু দাউদ: ৪৮৪৩)। ‘প্রবীণদের সঙ্গেই তোমাদের কল্যাণ ও বরকত রয়েছে।’ (মুস্তাদরাকে। 1634, 4843, 210. বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তির সংবাদ দেব না।

পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব

কুরআনের সুরা ইসরার ২৩-২৪ নম্বর আয়াতে পিতা-মাতার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বার্ধক্যে উপনীত পিতা-মাতার সামনে ‘উহ্’ শব্দটিও উচ্চারণ করা যাবে না এবং তাদের ধমক দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বরং তাদের সাথে বিনম্র ভাষায় কথা বলতে হবে এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে—’হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাঁদের প্রতি দয়া করো, যেমন তাঁরা আমাকে ছোটকালে দয়াবশে প্রতিপালন করেছিলেন।’ এমনকি পিতা-মাতা অমুসলিম হলেও তাদের সাথে সদাচরণ করা ইসলামের বিধান। রাসুল (সা.) আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)-কে তার মুশরিক মায়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

সামাজিক শিষ্টাচার ও প্রবীণদের অধিকার

  1. রাসুল (সা.) জামায়াত বা জনসমাবেশে প্রবীণ ও জ্ঞানীদের সামনের কাতারে স্থান দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
  2. উবায়দুল্লাহ বিন উমর (রা.)-এর বর্ণনায় পাওয়া যায়, সুলায়মান বিন আলী বয়োজ্যেষ্ঠদের উপযুক্ত আসনে বসানোর মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দিতেন।
  3. মুহাইয়াসা (রা.)-কে রাসুল (সা.) উপদেশ দিয়েছিলেন, কথা বলার ক্ষেত্রে যেন সর্বদা বয়সে বড়দের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

পিতা-মাতার চেহারার বরকত

পৃথিবীর তিনটি জিনিসের দিকে তাকালে সওয়াব অর্জিত হয়—কাবা শরিফ, পবিত্র কোরআন এবং পিতা-মাতার চেহারা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সন্তান যখন মহব্বতের নজরে পিতা-মাতার দিকে তাকায়, আল্লাহ প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজের সওয়াব দান করেন। এমনকি কেউ যদি দিনে শতবারও এমন দৃষ্টিতে তাকায়, তবে আল্লাহ তাকে সেই সওয়াব দেবেন। এটি প্রবীণ পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসার এক অনন্য স্বীকৃতি।

প্রবন্ধটির লেখক অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি এবং সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম। প্রবীণদের সম্মান ও সেবা করা কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, এটি ইহকাল ও পরকালের মুক্তির উপায়।

শেয়ার করুন