দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগ কেন্দ্রিক অস্থিরতা যেন থামছেই না। একের পর এক নিয়োগ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক ও সমালোচনার জের ধরে চুয়েটসহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের কারণে টানা আটদিন ধরে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও কর্মকর্তারাও এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন। চুয়েটের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে সরব ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি। বিশেষ করে, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় ড. সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক ড. শেখ শরিফুল আলমকে নিয়োগ দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন। বর্তমানে নতুন ভিসি অনলাইনে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করলেও ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরেনি। এতে বিষয়টি সুরাহা হওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন।
একইভাবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতেও নতুন ভিসি নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। গত ২৬শে সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমানকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট থেকে আসা কাউকে ভিসি হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি বারিধারার অস্থায়ী কার্যালয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, এই প্রতিষ্ঠানে এক বছরের ব্যবধানে এটি দ্বিতীয়বার ভিসি নিয়োগের ঘটনা। এর বাইরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়, যেখানে অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের অপসারণের দাবিতে গত ৭ই সেপ্টেম্বর থেকে ১১ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের পরপরই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নজির বেশ কয়েকটি। ১৪ই মে একসাথে ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের সময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আনিসুর রহমানকে নিয়োগ দেয়া হলেও, ঘণ্টা না পেরোতেই সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়। গাজীপুরের ডুয়েটের (ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ক্ষেত্রেও সরকার নিযুক্ত ভিসিকে প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীরা ‘ডুয়েট ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেছিলেন। ১৪ই মে নিয়োগ পাওয়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ক্যাম্পাসেই ঢুকতে দেয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল ক্যাম্পাস থেকেই ভিসি নিয়োগের। এই বিরোধের জের ধরে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। পরে ভিসি’র পদত্যাগের দাবিতে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা।
দ্রুত ভিসি পরিবর্তনের তালিকায় রয়েছে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও। ১৯শে জুলাই নিয়োগ পাওয়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. নাজমুস সাদাতকে মাত্র ৩৭ দিন পর ২৫শে আগস্ট সরিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ভিসি করা হয়। এছাড়া জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও টাইপিং বিভ্রান্তি ও পরবর্তী প্রজ্ঞাপন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল নানা জল্পনা। গত ১৪ই মে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে নিয়োগ দেয়ার পর, ৬ই জুন পুনরায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেনকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আবার একই নামে দুই ভিসি; ২৩ দিনের মাথায় জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) ভিসি বদল নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চললেও, নিয়োগের পর ভিসিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসায় এখন পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা ও গোয়েন্দা তথ্যের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজন সাবেক ভিসি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিয়োগের পর পুরনো কর্মকাণ্ডের ছবি বা তথ্য সামনে এনে বিতর্ক তৈরি করা অপমানজনক। তিনি মনে করেন, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া নতুন কিছু না হলেও, অন্তত যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা সরকারের দায়িত্ব। ভিসির পদ কোনো রাজনৈতিক পদ নয়, বরং পপুলিস্ট সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে। নিয়োগের পর আন্দোলন, বিতর্ক কিংবা অভিযোগ সামনে আসার পর ব্যবস্থা নেয়ার বদলে কেন এসব বিষয় নিয়োগের আগেই শনাক্ত করা যাচ্ছে না- এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেয়ার আগে প্রার্থীদের বিষয়ে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই ও তথ্য যাচাই করা হচ্ছে কিনা।
ইউজিসি’র সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম ফায়েজ বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকারের সচেতনতার অভাবকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও আন্তরিক হলে এসব সমস্যা এড়ানো সম্ভব ছিল। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, কোনো শিক্ষক যদি লবিংয়ের মাধ্যমে ভিসি হওয়ার চেষ্টা করেন, তবে শুরুতেই তার অযোগ্যতা প্রমাণিত হয়। তাই ভবিষ্যতে লবিং করা প্রার্থীদের আবেদন শুরুতেই বাতিলের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা না গেলে উচ্চশিক্ষার এই সংকট কাটে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।





