হাসপাতালে লোডশেডিংয়ের কবলে চিকিৎসাসেবা, অন্ধকারে ওটি

প্রকাশ:

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম। রোগীকে সুস্থ করে জীবনে আলো ফেরানোর যে প্রতিষ্ঠান, সেই হাসপাতালগুলোই এখন ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জেনারেটর বা আইপিএসের পর্যাপ্ত ব্যাকআপ না থাকায় অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) অনেক সময় টর্চ বা মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে ছোটখাটো অস্ত্রোপচার করতে হচ্ছে।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের মো. রবিউল ইসলাম জানান, প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে রেডিওথেরাপির মেশিন বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্লাডব্যাংকের যন্ত্রপাতিতে রক্ত সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়। তার মতে, আইপিএস ও জেনারেটরের ব্যাকআপ থাকলেও তা হাসপাতালের সক্ষমতার তুলনায় অপ্রতুল, ফলে সব সরঞ্জাম একসঙ্গে চালানো সম্ভব হয় না।

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানান, ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার রোস্টার ডিউটির মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। কিছুদিন আগে পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল। জেনারেটর নষ্ট থাকলে টর্চ ও মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়েও ছোটখাটো ওটির কাজ করতে হয়। তাদের অভিযোগ, নতুন ভবনে জেনারেটর থাকলেও সব জায়গায় এর সুবিধা পাওয়া যায় না। জরুরি বিভাগে একটি আইপিএস আছে। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকা এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ মিলে হাসপাতালের পরিবেশ গুমোট হয়ে ওঠে। এতে রোগীদের কষ্ট আরও বাড়ে। হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, জেনারেটরের ম্যাগনেটিক এটিএস নষ্ট থাকায় প্রায় ২০-২৫ দিন ব্যাকআপ বন্ধ ছিল, যা পরে গণপূর্ত বিভাগের সহায়তায় মেরামত করা হয়েছে। তবে বড় জেনারেটরটি চালাতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৭ লিটার তেল লাগে, যার সীমিত বরাদ্দের কারণে সবসময় এটি চালানো সম্ভব হয় না। সাধারণত সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পিক আওয়ারে জেনারেটরের ব্যাকআপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জরুরি বিভাগ, ওটি ও প্যাথলজি পরীক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে। ল্যাবে থাকা দামি রিএজেন্ট নষ্ট হচ্ছে এবং পরীক্ষার রিপোর্ট ভুল হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে সেবা কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তীব্র গরমে শিশু, বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের কষ্ট চরম আকার ধারণ করেছে।

জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ খালেদ বিন ইসমাইল বলেন, আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউসহ বিভিন্ন ইউনিটের ভেন্টিলেশন সাপোর্ট, সিরিঞ্জ পাম্প ও ফটোথেরাপির মতো যন্ত্রগুলো বিদ্যুৎনির্ভর। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে এসব ইউনিটে সেবা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ইবনে সিনা ট্রাস্টের এজিএম (অ্যাডমিন) মোহাম্মদ জাকির হোসেনের মতে, গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত বিকল্প ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. নূরুল ইসলাম জানান, জরুরি অপারেশনের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্থানীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছে এবং জরুরি সেবায় লোডশেডিং কমাতে নির্দেশনা দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, জরুরি বিভাগ ও অপারেশন কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়ে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া থাকে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ন্যূনতম জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং নিয়ে নতুন কোনো আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শেয়ার করুন